সুপ্রিম কোর্ট
দেশের বিচার বিভাগের আকাশে যে নতুন ভোরের আভাস ফুটেছিল, তা যেন আবার ম্লান হতে শুরু করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে গড়া স্বাধীনতার সেই স্বপ্নময় অধ্যায়—যেখানে বিচার বিভাগকে নির্বাহী শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার আকাঙ্ক্ষা জেগেছিল—তা এখন ফিরে যাচ্ছে পুরোনো বাঁধনে, পুরোনো নিয়মে, পুরোনো নিয়ন্ত্রণে।
সংসদীয় বিশেষ কমিটির এক সিদ্ধান্তে যেন থমকে গেল সেই অগ্রযাত্রা। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠনের অধ্যাদেশ, বিচারক নিয়োগে নতুন কাঠামো—সবকিছুই এখন বাতিলের পথে। যে সচিবালয়কে একদিন বলা হয়েছিল ইতিহাসের নতুন অধ্যায়, সেটিই এখন বিলুপ্তির মুখে দাঁড়িয়ে। যেন এক অসমাপ্ত প্রেমের গল্প—যেখানে শুরুটা ছিল আশার, কিন্তু শেষটা অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঢাকা।
অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ, যা কিছুদিন আগে বিচার বিভাগের নিজস্ব কাঠামোর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল, তা আবার ফিরে যাচ্ছে আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে। আর উচ্চ আদালতের বিচারপতি নিয়োগ—যেখানে স্বচ্ছতা আনার প্রয়াস ছিল—তা আবার চলে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের ঘেরাটোপে।
গত বছর ২১ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ জারির পর ওই বছরের ২৫ আগস্ট প্রথম মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে উচ্চ আদালতে ২৫ জন অতিরিক্ত বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়। সংবিধানে আইনে নির্ধারিত যোগ্যতায় বিচারক নিয়োগের বিধান থাকলেও, কখনও আইন হয়নি। বিচারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচারক নিয়োগের কোনো আইন না থাকায় সরকারদলীয় লোককে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে আসছিল।
সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে অন্যান্য বিচারপতি নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। আবার ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া আর কোনো কাজ করতে পারেন না। ফলে উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগ শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর পছন্দেই হয়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অধ্যাদেশে বিধান করা হয়, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের একজন ও হাইকোর্টের দুজন বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেল এবং প্রধান বিচারপতির মনোনীত সাবেক একজন বিচারপতি ও একজন অধ্যাপককে নিয়ে গঠিত কাউন্সিল পরীক্ষার মাধ্যমে বিচারপতি পদে নিয়োগে যোগ্য ব্যক্তি বাছাই করবে। তারপর রাষ্ট্রপতির কাছে নিয়োগের নাম পাঠাবে। এই প্রস্তাব প্রধান বিচারপতির পরামর্শ হিসেবে গণ্য হবে। অধ্যাদেশটি রহিতের সিদ্ধান্তে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষমতা ফের সরকারের হাতে যাচ্ছে।
আইনজীবীদের কণ্ঠে তাই হতাশার দীর্ঘশ্বাস। তাদের চোখে এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার স্বপ্নে এক গভীর আঘাত। কেউ কেউ বলছেন, এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে—স্বাধীন বিচার বিভাগের পথে হাঁটার ইচ্ছাই যেন নেই।
তবে ভিন্ন সুরও আছে। কেউ কেউ মনে করেন, আগের অধ্যাদেশগুলো ছিল ত্রুটিপূর্ণ, অসম্পূর্ণ। তাই নতুন করে, সবার মতামত নিয়ে, আরও ভারসাম্যপূর্ণ একটি আইন তৈরি করাই হতে পারে সঠিক পথ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই “নতুন” কতটা দ্রুত আসবে? আর ততদিনে কি বিচার বিভাগের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয়ে যাবে না? স্মরণ করা যায় সেই দিনটিকে—যখন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের উদ্বোধনে উচ্চারিত হয়েছিল দৃঢ় প্রত্যয়,এই ধারাবাহিকতা যেন অটুট থাকে। কিন্তু আজ সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে।
এ যেন এক অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির গল্প—যেখানে স্বাধীনতার হাতছানি ছিল, কিন্তু বাস্তবতার দেয়ালে তা আটকে গেল। বিচার বিভাগের সেই কাঙ্ক্ষিত মুক্তি, সেই কাঠামোগত স্বাধীনতা—এখনও রয়ে গেল অধরা, ঠিক যেন দূরের কোনো আলোর মতো, যা দেখা যায়, কিন্তু ছোঁয়া যায় না।
