জাতীয় সংসদের নীরব কক্ষে হঠাৎই যেন ছড়িয়ে পড়ল এক অদ্ভুত শিহরণ। সংখ্যার ভেতরে লুকিয়ে থাকা গল্পগুলো যেন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে লাগল—অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কণ্ঠে উঠে এলো দেশের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা। কিন্তু তালিকার অর্ধেক জুড়ে এক নাম—এস আলম—যেন এক রহস্যময় আধিপত্যের প্রতিচ্ছবি।
সোমবারের সেই অধিবেশনে ঋণের অঙ্ক গোপন থাকলেও নামগুলোই যেন যথেষ্ট ছিল আলোড়ন তোলার জন্য। প্রথম ১০-এর মধ্যে ৯টিই এস আলম গ্রুপের, আর ১৭ নম্বরটিও তাদের দখলে—যেন অর্থনীতির বুকে এক অদৃশ্য জাল বিস্তার করে আছে এই গোষ্ঠী।
এস আলম সুপার এডিবল অয়েল, ভেজিটেবল অয়েল, রিফাইন্ড সুগার, কোল্ড রোলড স্টিলস—একটির পর একটি প্রতিষ্ঠানের নাম উচ্চারিত হতে থাকলে সংসদ কক্ষ যেন মুহূর্তে ভারী হয়ে ওঠে। সোনালী ট্রেডার্স, গ্লোবাল ট্রেডিং, চেমন ইস্পাত—সব মিলিয়ে যেন এক বিস্তৃত সাম্রাজ্যের গল্প, যার ছায়া এখন ঋণখেলাপির তালিকায় স্পষ্ট। অন্যদিকে, তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে সিকদার গ্রুপের তিন প্রতিষ্ঠান এবং সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপের দুটি কোম্পানি। ক্ষমতা ও প্রভাবের সঙ্গে অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব যেন ফুটে ওঠে এই তালিকায়।
তালিকার মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা কেয়া কসমেটিকস, দেশবন্ধু সুগার মিলস কিংবা কর্ণফুলি ফুডস—প্রতিটি নামই যেন একেকটি গল্প বলে, যেখানে সাফল্যের স্বপ্ন কখনো কখনো ঋণের ভারে নুয়ে পড়ে। আর একসময়কার গর্ব—দেশের প্রথম মোবাইল অপারেটর সিটিসেল—আজ সেই তালিকার ১৫ নম্বরে। সময়ের নির্মমতায় বদলে যাওয়া বাস্তবতার এক নীরব সাক্ষী।
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া এই অধিবেশনে প্রশ্ন তুলেছিলেন এনসিপির এমপি হাসনাত আবদুল্লাহ—কত এই খেলাপি ঋণ, কারা দায়ী, আর কীভাবে তা আদায় হবে? উত্তর মিলেছে আংশিক, কিন্তু প্রশ্ন যেন আরও গভীর হয়েছে।
সংসদের সেই দিনটি তাই শুধু একটি তালিকা প্রকাশের দিন নয়—এ যেন অর্থনীতির অন্তর্গত অস্থিরতার এক নাটকীয় উন্মোচন, যেখানে সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে আছে ক্ষমতা, প্রভাব আর দায়বদ্ধতার জটিল প্রেম-দ্বন্দ্বের গল্প।
