ছবি: বাসস
পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলাম পার্টির নাম বহাল রেখে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিতে বিল পাস করেছে সংসদ। এতে জামায়াতের পক্ষ থেকে আপত্তি জানিয়ে দলটির আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বক্তব্য দেন। তবে তাদের জোট সঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পক্ষ থেকে এই বিলের ওপর কোনো আপত্তি নেই বলে স্পিকারকে লিখিতভাবে জানানো হয়।
আজ বৃহস্পতিবার সংসদের বৈঠকে বিলটি উত্থাপন করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। পলে বিলটি কন্ঠভোটে পাস হয়। বিরোধী দলীয় নেতা বিলের ওপর আপত্তি দিতে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ বক্তব্য রাখলেও বিলের কোন ধারায় তিনি সংসদের চান তা উল্লেখ করেননি। ফলে স্পিকার তার আপত্তির বিষয়টি নিস্পত্তি করতে ভোট দেননি এবং বিপরীতে মন্ত্রীও কোনো জবাব দেননি।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু বিল আকারে উত্থাপনের জন্য সুপারিশ করেছে সংসদের বিশেষ কমিটি। বিশেষ কমিটির ওই প্রতিবেদনে নোট অব ডিসেন্ট ‘আপিত্ত’ জানিয়ে জামায়াতের এমপিরা বলেছিলেন, ‘অধ্যাদেশটি বর্তমান অবস্থায়, কোনো পরিবর্তন ছাড়া পাস হলে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামীর মতো দলগুলো পাকিস্তানের হিসেবে বিদ্যমান থেকে যাবে, যা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়।
তারা এই অধ্যাদেশের ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ এবং মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা পরিবর্তনের দাবি রাখে। কমিটির প্রতিবেদনে জামায়াতের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, ২০০২ সালে খালেদা জিয়ার সরকারের আইনে দলগুলোকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী বলা হয়নি। রাজনৈতিক দলকে সশস্ত্র বাহিনী চিহ্নিত করা ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সমর্থন।
কী আছে অধ্যাদেশে- অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা এই অধ্যাদেশে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা সহযোগী, মুক্তিযোদ্ধা পরিবার এবং মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যের সংজ্ঞা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
কারা হবেন বীর মুক্তিযোদ্ধা- জারি করা অধ্যাদেশে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বলা হয়, ‘১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন এবং যেসব ব্যক্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং যারা স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় সহযোগী রাজাকার, আল–বদর, আল-শামস, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, এমন বেসামরিক নাগরিকেরা (ওই সময়ে যাদের বয়স সরকার নির্ধারিত সর্বনিম্ন বয়সের মধ্যে ছিল) মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবেন। এর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী, মুক্তিবাহিনী, বিএলএফ ও অন্যান্য স্বীকৃত বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর), নৌ-কমান্ডো, কিলো ফোর্স ও আনসার সদস্যরাও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য হবেন।’
জারি করা অধ্যাদেশে ‘মুক্তিযুদ্ধ’-এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় হানাদার ও তাদের সহযোগী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধ।
বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্য
বিরোধী দলের নেতা বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা চেয়েছিলেন দেশটা মানবিক হবে এবং সমাজের সর্বক্ষেত্রে ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু স্বাধীনতার পরে হয়েছিল তার পুরাটাই উল্টা। জনগণের রায়কে সম্মান দেখাতে ব্যর্থ ও অস্বীকার করার কারণে যে যুদ্ধটি (মুক্তিযুদ্ধ) অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বেদনার সঙ্গে লক্ষ্য করা গেল, দেশের (স্বাধীনতার পর) শাসকেরা সেটা ভুলে গেলেন। এক পর্যায়ে তারা বহুদলীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করলেন। ১৯৭৫ সালে এই সংসদে মাত্র সাত মিনিট আলোচনা করে দেশের সবগুলো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এমনকি আওয়ামী লীগ এতটাই বেপরোয়া ছিল যে, ১৯৭০ ও ৭৩ সালে আওয়ামী লীগ নামে নির্বাচন করে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগকেও নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি প্রয়াত জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরে এসেছে এবং এই সংসদ সে ধারাবাহিকতার অংশ।
জামুকা আইনের সংজ্ঞার বিষয়ে তিনি বলেন, এ জিনিসটা স্বাধীনতার পরে তখনকার সরকার আনেন নাই। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সরকার আনেন নাই। এ জিনিসটা সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন ফ্যাসিস্টের বিকৃত প্রতীক শেখ হাসিনা। পরবর্তী পর্যায়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ধারাবাহিকতা রেখেছে সামান্য পরিবর্তন করে। সেখানে আছে তৎকালীন তিনটা সংগঠনের নাম নেওয়া হয়েছে— তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজাম ইসলাম পার্টি। পাক বাহিনী ও তার সহায়ক শক্তির সঙ্গে তিনটা রাজনৈতিক দলের নাম এসেছে। বর্তমান উপস্থাপনায় তৎকালীন সংগঠনের কথা বলা হয়েছে।
জামায়াত আমির বলেন, আল্লাহ ভালো জানেন, একাত্তর সালের সেই চরম সময়ে কার কী ভূমিকা ছিল। আল্লাহই পূর্ণাঙ্গ একমাত্র সাক্ষী। বাকী আমরা যারা আছি তারা আংশিক সাক্ষী। আমরা চাই, বাংলাদেশ রাজনীতির সুস্থ ধারায় চলুক, জনগণের প্রতি দায়-দরদ নিয়ে, দেশের প্রতি ভালোবাসা দেশের প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
১৯৭৯ সালে জারি করা রাজনৈতিক দল অধ্যাদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের পুনর্জন্ম হয় উল্লেখ করে বিরোধী দলের নেতা বলেন, সে সময় থাকা সব রাজনৈতিক দল তাদের অধিকার ফিরে পায়। আমরাও (জামায়াতে ইসলামী) সে সময় ফিরে পেয়েছি। সেই দায়-দরদ নিয়ে ১৯৭৯ সাল থেকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার চেষ্টা করছি। আগামীর দিনগুলোতেও আর জাতিতে বিভক্ত নয়, বরং ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো, সম্মানের জাতি গঠন করতে পারি। সব দলের এটাই অঙ্গীকার। আমরা জাতিকে আর বিভক্ত করতে চাচ্ছি না।
