সোমবার, ৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

অস্ট্রেলিয়ায় ১১ বছর, তবু পদোন্নতির দৌড়ে সবার ওপরে!জাল সনদ থেকে বদলি বাণিজ্য—গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামানকে ঘিরে অভিযোগের পাহাড়

আবদুর রহমান
সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬ ১১:৩৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার কমিশন, পদোন্নতিতে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, কথিত জাল পিএইচডি সনদ ব্যবহার এবং গুরুত্বপূর্ণ ভবনের নকশা অনুমোদন—একাধিক অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব নেওয়ার পর অধিদপ্তরে নিজের পছন্দের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে তোলেন তিনি। সেই বলয়ের মাধ্যমে বদলি-পদায়ন থেকে শুরু করে টেন্ডার এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও উঠেছে।

ভুয়া পিএইচডি সনদ দেখিয়ে উচ্চশিক্ষা ছুটি ও প্রেষণ ভোগের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছিল। তদন্তে জালিয়াতি ও অসদাচরণের বিষয় প্রমাণিত হওয়ার পরও কঠোর শাস্তির পরিবর্তে তুলনামূলক লঘুদণ্ড পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এরপর অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই দফা পদোন্নতি পেয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার ঘটনাও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের ডিঙিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব পাওয়াকে ঘিরেও তৈরি হয় বিতর্ক। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার কমিশন আদায়, সহকর্মীদের বিরুদ্ধে সাজানো মামলা ব্যবহারের চেষ্টা এবং দেশে-বিদেশে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা পড়েছে বলে জানা গেছে।

৫ আগস্টের পরই ‘ক্ষমতার উত্থান’, এরপর সিন্ডিকেট?

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব পাওয়ার পর খালেকুজ্জামান চৌধুরী নিজের পছন্দের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে তোলেন। এ বলয়ের মাধ্যমে বদলি-পদায়ন, পদোন্নতি, টেন্ডার কমিশন এবং বিভিন্ন দপ্তর থেকে কাজ আনার ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান, ঢাকা সার্কেল-১ থেকে সদ্য বদলি হওয়া তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খান এবং ঢাকা সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরীর নামও এসেছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

লটারির বাক্সেই কি আগে থেকে ঠিক করা ছিল নাম?

স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সহকারী ও উপসহকারী প্রকৌশলীদের বদলি লটারির মাধ্যমে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলিতে সেই স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন একাধিক প্রকৌশলী।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, লটারি শুরুর আগেই পরিচিত ও তদবির করা কর্মকর্তাদের নাম নির্দিষ্ট বাক্সে রাখা হয়। পরে সেই বাক্স থেকে নাম উঠিয়ে তাদের ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়ন দেওয়া হয়েছে। কারও কারও নিজ জেলায় বা পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের ক্ষেত্রেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

এ নিয়ে প্রকৌশলীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র অসন্তোষ। তাদের অভিযোগ, লটারির নামে যদি আগে থেকেই পছন্দের পোস্টিং নিশ্চিত করা হয়, তাহলে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

একই কর্মকর্তার নাম একাধিক স্থানে, কারও লটারি বদলে দেওয়ার অভিযোগ

সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আবু তাহের মোহাম্মদ খাইরুল বাশারকে রংপুর থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ উপবিভাগে, গোলাম রাব্বিকে লালমনিরহাট থেকে রক্ষণাবেক্ষণ উপবিভাগে এবং ছাইফুল ইসলামকে নারায়ণগঞ্জ থেকে হাইকোর্ট উপবিভাগে বদলি করা হয়েছে।

এ এস এম সাখওয়াত ইসলাম ও রেজাউল করিম মিঠুকেও ফের ঢাকায় পদায়নের অভিযোগ রয়েছে। সাখওয়াত ইসলাম এর আগে রাজারবাগ গণপূর্ত উপবিভাগ-১, গণপূর্ত রেলওয়ে ডাইভারশন উপবিভাগ ও শেরে-বাংলা উপবিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বাড়ি বগুড়ায় হলেও এবার তাকে মিরপুর উপবিভাগে পদায়ন করা হয়েছে।

ফরিদপুরের রেজাউল করিম মিঠু মতিঝিল, শেরে-বাংলা উপবিভাগ-৩, মহাখালী ও ঢাকা গণপূর্ত উপবিভাগ-৭-এ দায়িত্ব পালনের পর এবার ঢাকা সম্পদ উপবিভাগে পদায়ন পেয়েছেন।

অন্যদিকে, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জয় চৌধুরীর নাম চট্টগ্রাম রক্ষণাবেক্ষণ উপবিভাগ-১-এর জন্য উঠলেও নিজ জেলার অজুহাতে লটারির ফল পরিবর্তন করে তাকে অন্যত্র বদলি করার অভিযোগ উঠেছে।

প্রশ্ন উঠেছে, একই নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হয়েছে কি না।

ঢাকা নিজ জেলা হওয়া সত্ত্বেও মো. মেহবুবুর রহমান ও মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামকে যথাক্রমে পিলখানা গণপূর্ত উপবিভাগ ও রমনা গণপূর্ত উপবিভাগ-৩-এ পদায়ন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা বিভাগের নিজ জেলা থাকা সত্ত্বেও প্রকৌশলী বরকত মজুমদার ও শেখ মোহাম্মদ এনামুল হককে চুয়াডাঙ্গা ও চট্টগ্রামে বদলি করা হয়েছে।

এ ছাড়া ময়মনসিংহের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আনোয়ার হোসাইনের নাম লটারিতে একই সঙ্গে ফরিদপুর ও নরসিংদী জেলার আওতায় ওঠার অভিযোগ রয়েছে। পরে তাকে ফরিদপুরে পদায়ন করা হয়।

চাকরি জীবনে কখনো ঢাকার বাইরে দায়িত্ব পালন না করা প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান সাদকেও উত্তরা উপবিভাগ, ঢাকা গণপূর্ত উপবিভাগ-৩, ঢাকা গণপূর্ত উপবিভাগ-৬ (হাইকোর্ট) হয়ে এবার তেজগাঁও উপবিভাগে পদায়ন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

মো. মামুনুর রশিদের নিজ জেলা রংপুর হলেও দীর্ঘ সময় সাভারে দায়িত্ব পালনের পর চট্টগ্রামে বদলি করা হয়। কিন্তু এক বছর না যেতেই তাকে গাজীপুরে পদায়ন এবং পরে লটারির প্রক্রিয়ায় আবার ঢাকার উপবিভাগে আনার অভিযোগ রয়েছে।

নেত্রকোনার ইজাজ আহমেদ খানের লটারি ময়মনসিংহ বিভাগের আওতায় হওয়ার কথা থাকলেও লটারির আগে তাকে ঢাকার বাক্সে স্থানান্তর করা হয় এবং পরে শেরেবাংলা নগর উপবিভাগ-৯ থেকে ধানমন্ডিতে পদায়ন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

৬৫ কর্মকর্তা, লেনদেন ১০ লাখ থেকে কোটি টাকা?

বদলি-পদায়নকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ অর্থ লেনদেনের। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত ৬৫ প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাকে পছন্দের কর্মস্থলে পদায়ন করে দিতে ১০ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব লেনদেনের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিংবা আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত কিছু কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বাসনের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।

চলতি বছরের ৩ মার্চ পৃথক কয়েকটি প্রজ্ঞাপনে এক দিনেই অর্ধশতাধিক নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়। এত বড় পরিসরে বদলির আগে মন্ত্রণালয়কে যথাযথভাবে অবহিত করা হয়েছিল কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

বিষয়টি নিয়ে প্রধান প্রকৌশলীকে তলব করে গণপূর্তমন্ত্রী ব্যাখ্যা চান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় ৫ ও ৮ মার্চ পৃথক আদেশে আগের গণবদলির অধিকাংশ বাতিল করা হয় বলেও জানা গেছে।

তবে পরবর্তী সময়ে ছোট পরিসরের বদলি-পদায়নেও অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।

এক প্রকল্পে একাধিক প্যাকেজ, বাড়তি বিলের অভিযোগ

খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে শুধু বদলি-পদায়ন নয়, অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পের বিল-ভাউচার নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এক প্রকল্পের একাধিক প্যাকেজ দেখিয়ে কাজের তুলনায় অতিরিক্ত বিল উত্তোলন, কাজ সম্পন্ন না করেই বিল প্রদান এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বরং বিভিন্ন অনিয়মে সাময়িকভাবে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের পুনর্বহালে নানা কৌশল নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ গণপূর্ত অধিদপ্তরে আনা এবং নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ঠেকানোর নামেও ফান্ড সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র বা স্বাধীন যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।

‘জাল পিএইচডি’ সনদে বিভাগীয় মামলা, এরপর দুই পদোন্নতি

খালেকুজ্জামান চৌধুরীর চাকরি জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি কথিত জাল পিএইচডি সনদ। মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, ভুয়া পিএইচডি সনদ ব্যবহার করে উচ্চশিক্ষা ছুটিতে প্রেষণ ভোগের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্তে জালিয়াতি ও অসদাচরণের বিষয় প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি দোষ স্বীকার করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপরও কঠোর শাস্তির পরিবর্তে এক বছরের জন্য বেতন বৃদ্ধি বন্ধের দণ্ড দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির সুপারিশের কারণে তিনি তুলনামূলক লঘুদণ্ড পান।

এরপর মাত্র তিন বছরের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং পরবর্তী পাঁচ মাসের মধ্যে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পাওয়ার বিষয়টি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দেয়। অর্থাৎ এক বছরের মধ্যেই দুই দফা পদোন্নতির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় ১১ বছর, পদোন্নতির সময় দেশে ফেরার অভিযোগ

১৯৮৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চাকরি জীবনে সরকারি প্রেষণ ও ছুটির সুযোগ নিয়ে খালেকুজ্জামান চৌধুরী প্রায় ১১ বছর অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট নথির বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হলেই তিনি দেশে ফিরে আসতেন। বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী সময়ে তার দ্রুত পদোন্নতি পাওয়ার বিষয়টি তাই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

জ্যেষ্ঠদের ডিঙিয়ে প্রধান প্রকৌশলী—পদোন্নতির তালিকাতেও বিতর্ক

প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার প্রক্রিয়ায় জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের নথির বরাত দিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে, জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের ডিঙিয়ে পদোন্নতির সংক্ষিপ্ত তালিকায় নিজের নাম প্রথমে দেন খালেকুজ্জামান চৌধুরী। অথচ দাপ্তরিক জ্যেষ্ঠতার তালিকায় তার আগে ছিলেন মো. আবুল খায়ের ও উৎফল কুমার দে।

অভিযোগ আরও গুরুতর হয়েছে এ কারণে যে, প্রতিযোগী হিসেবে বিবেচিত কয়েকজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দায়ের করা মামলার তথ্য সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডে (এসএসবি) পাঠানো হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের অভিযোগ, এভাবে তাদের স্থায়ীভাবে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

‘সাজানো মামলা’ দিয়ে সহকর্মীদের ফাঁসানোর অভিযোগ

পদোন্নতির দৌড়ে প্রতিদ্বন্দ্বী কয়েকজন প্রকৌশলীকে সরিয়ে দিতে রামপুরা থানার একটি মামলায় কৌশলে ৪৭ প্রকৌশলীর নাম ঢোকানোর অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, মামলার নথি এসএসবি কমিটির কাছে পাঠানো হয়, যাতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

গত ৬ জুলাই গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঁচজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর নামের তালিকা পাঠানো হয় বলেও জানা গেছে। দাপ্তরিক জ্যেষ্ঠতার তালিকায় শীর্ষে থাকা কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে খালেকুজ্জামান চৌধুরীর নাম তালিকার প্রথম দিকে রাখার বিষয়টিও প্রশ্ন তুলেছে সংশ্লিষ্টরা।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের ফলাফল প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।

গ্রিন কোজি কটেজের নকশা অনুমোদনেও নাম

বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের মৃত্যু ও ১৩ জন আহত হওয়ার ঘটনা এখনো দেশের অন্যতম মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড হিসেবে আলোচিত।

অগ্নিকাণ্ডের পর ভবনটির নকশা অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়, ২০১১ সালে ভবনটির নকশা অনুমোদনের সঙ্গে তৎকালীন রাজউক অথরাইজড অফিসার মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর নামও ছিল।

তদন্তে ভবনটিতে জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা না থাকা এবং পর্যাপ্ত সিঁড়ির ঘাটতির বিষয় উঠে আসে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব ঘাটতি থাকায় আগুনের সময় প্রাণহানি ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনে নিজের সম্পৃক্ততা কমিয়ে দেখাতে তিনি বিভিন্নভাবে তদবির করেছিলেন। তবে ভবনের নকশা অনুমোদনের দায় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তার ভূমিকা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

এরপর ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পাওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।

সাংবাদিকদের প্রবেশে কড়াকড়ি, ‘অভিযোগ আড়ালের চেষ্টা’?

প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপের বিষয়টিও নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য যাতে গণমাধ্যমে না আসে, সে জন্যই সাংবাদিকদের প্রবেশ ও তথ্য সংগ্রহে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে। তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

খালেকুজ্জামান: ‘কোনো অনিয়ম হয়নি’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বদলি প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন।

তিনি বলেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলিতে কোনো অনিয়ম হয়নি এবং বিষয়টি মন্ত্রণালয় অবগত।

নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারির মাধ্যমে বদলি করা হবে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্বাহী প্রকৌশলীরা। তাদের বদলি লটারির মাধ্যমে নয়, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে করা হবে।

জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের প্রতিযোগী মনে করে ছাত্র হত্যা মামলার নথি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার কোনো প্রতিযোগী নেই।

সচিবের বক্তব্য : অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী বদলিতে অনিয়ম হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি করা হবে না—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার দায়িত্ব প্রধান প্রকৌশলীকে দেওয়া হয়নি।

প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার দৌড়ে থাকা কর্মকর্তাদের প্রতিযোগী হিসেবে বিবেচনা করে তাদের বিরুদ্ধে হওয়া ছাত্র হত্যা মামলার নথি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এবং হয়রানির অভিযোগ প্রসঙ্গে সচিব বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরে একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধেও বিভিন্ন লেখালেখি হচ্ছে এবং বিষয়টি মন্ত্রণালয় পর্যবেক্ষণ করছে।

তিনি বলেন, খালেকুজ্জামান ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী হয়েছেন গত বছর। তালিকা অনুযায়ী তিনি তিন নম্বরে আছেন এবং তার সিনিয়র কর্মকর্তাও রয়েছেন। প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার জন্য গ্রেড-১ সংক্রান্ত যাচাই-বাছাই এসএসবিতে পাঠানো হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী যিনি যোগ্য বিবেচিত হবেন, তাকেই প্রধান প্রকৌশলী করা হবে।

এখন প্রশ্ন একটাই—অভিযোগের পাহাড়, তদন্ত কোথায়?

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো শুধু ব্যক্তিগত বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বদলি-পদায়নের স্বচ্ছতা, প্রকৌশলীদের প্রশাসনিক ন্যায়বিচার, সরকারি প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির প্রশ্ন।

জাল সনদ, দ্রুত পদোন্নতি, দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার কমিশন এবং সহকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ব্যবহারের মতো অভিযোগগুলো সত্য কি না—তার উত্তর দিতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্ত।

অভিযোগকারীরা বলছেন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অর্থ ও প্রভাবের ছায়া থাকলে গণপূর্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হবে। অন্যদিকে প্রধান প্রকৌশলী সব অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ফলে এখন নজর মন্ত্রণালয়, দুদক ও সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার দিকে—অভিযোগের পাহাড় কি কেবল অভিযোগই থাকবে, নাকি বেরিয়ে আসবে সত্যের পুরো চিত্র?

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ