চিপস কিনতে গিয়ে বেঁচে গেল বাবা-মেয়ে—ফিরে এসে পেলেন মৃত্যু সংবাদ, ঈদের ছবি এখন শেষ স্মৃতি। ছবি: সংগৃহীত
ঈদের আনন্দঘন মুহূর্তে তোলা একটি ছবি—কানে লাল ফুল গোঁজা ছোট্ট নওয়ারা, বাবার কোলে হাসিমুখে। পাশে মা আয়েশা, কোলে সাত মাসের শিশু আরশান।
সেই ছবিই এখন নুরুজ্জামানের কাছে এক টুকরো স্বর্গ—আর একইসঙ্গে অসহনীয় যন্ত্রণার শেষ স্মারক।
বুধবার পদ্মা নদীর বুকে ভয়াবহ বাসডুবির ঘটনায় এক মুহূর্তেই ভেঙে যায় এই সুখের সংসার।সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসে স্ত্রী ও সন্তানকে রেখে চার বছরের মেয়ে নওয়ারাকে নিয়ে চিপস কিনতে গিয়েছিলেন নুরুজ্জামান। কিন্তু ঘাটে ফিরে তিনি শুনলেন—বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে তলিয়ে গেছে।
সেই মুহূর্তে যেন তার মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ে।
স্ত্রী আয়েশা আক্তার আর সাত মাসের ছেলে আরশান—দুজনেই হারিয়ে গেলেন পদ্মার কালো জলে। এক ফোনকল,এক জীবনের শেষ ভরসা ভেঙে যাওয়া
নাতি-নাতনিকে বিদায় দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাবার ফোনে আসে সেই হৃদয়বিদারক সংবাদ। কাঁদতে কাঁদতে নুরুজ্জামান শুধু বলতে পেরেছিলেন—আব্বা, আমার সব শেষ… আপনার বৌমা আর আরশান পদ্মায় তলিয়ে গেছে। ঘাটে দীর্ঘ প্রতীক্ষা—তারপর গভীর রাতে উদ্ধার হলো নিথর দেহ। মায়ের সঙ্গে চিরঘুমে ঢলে পড়েছে ছোট্ট আরশানও।
এদিকে শৈলকুপার বাড়িতে নেমে এলো শোকের নীরবতা।
ঝিনাইদহের শৈলকুপার খন্দকবাড়িয়া গ্রাম—যেখানে কয়েকদিন আগেও ছিল ঈদের আনন্দ, আজ সেখানে শুধুই নিস্তব্ধতা। নুরুজ্জামানের বাবা কামরুজ্জামান প্রস্তুতি নিচ্ছেন ছেলের পরিবারকে শেষ বিদায় জানানোর জন্য।
সাভারের নয়ারহাটে দাফন করা হবে মা ও শিশুকে—একই কবরে, চিরতরে পাশাপাশি।
শেষ দেখা, শেষ কথা—সবই এখন স্মৃতি- ঢাকায় ফেরার আগের রাতে আত্মীয়কে বলেছিলেন নুরুজ্জামান আগামীকাল চলে যাচ্ছি, দেখা হবে না…আবার। সেই কথাই যেন হয়ে উঠল জীবনের শেষ বিদায়। প্রতি ঈদেই গ্রামের বাড়িতে বিনামূল্যে চিকিৎসা শিবির বসাতেন এই দম্পতি। মানুষের সেবা করা যাদের অভ্যাস ছিল, ভাগ্য তাদের জন্য লিখে রাখল নির্মম এক পরিণতি।
একটি লাল ফুল, এক অসমাপ্ত শৈশব- চার বছরের নওয়ারা—যার কানে গোঁজা লাল ফুলটি এখনো জীবনের রঙের প্রতীক হয়ে আছে— সে বেঁচে আছে, কিন্তু হারিয়েছে তার সবচেয়ে আপন দুইজনকে। ঈদের সেই ছবিতে জমে থাকা হাসি আজ রক্তক্ষরণ হয়ে ঝরছে—
একটি পরিবারের সব সুখ, সব স্বপ্ন, সব ভালোবাসা যেন পদ্মার জলে ডুবে গেছে। নিয়তির ভয়াবহ নির্মমতার কালের সাক্ষী হয়ে আছে।
