কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে ক্রমেই জটিলতার জালে আটকে পড়ছেন সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আমিনুল ইসলাম। তদন্তের পর্দা উঠতেই যেন একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য সামনে আসছে, আর তাতে প্রশাসনিক অন্দরমহলে বইছে চাপা উত্তেজনা। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) গঠিত তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় শুরু করেছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রক্রিয়া। ইতোমধ্যে উপসচিব (শৃঙ্খলা) মো. আশরাফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত
এক নোটিশে জানতে চাওয়া হয়েছে—কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। সেই নোটিশের জবাব দিয়েছেন আমিনুল ইসলাম, তবে সেই জবাব আদৌ তাকে রক্ষা করতে পারবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। উপসচিব আশরাফুল ইসলামের ভাষায়, জবাব বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি গুরুতর হওয়ায় প্রয়োজনে নিরীক্ষাও হতে পারে।” অর্থাৎ, ঝড় থামেনি—বরং আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
অন্যদিকে অভিযুক্ত অধ্যক্ষের সুর কিছুটা স্থির, কিছুটা আত্মবিশ্বাসী। তিনি বলেন, আমি নিয়ম মেনেই জবাব দিয়েছি। মন্ত্রণালয় যা সিদ্ধান্ত নেবে, তাই হবে। কিন্তু তার এই শান্ত স্বর কি আসন্ন ঝড়ের আগাম নীরবতা?
তদন্তে উঠে এসেছে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য—
কলেজের মাইক্রোবাস শহরের ভেতরেই চলাচল করলেও মাত্র তিন মাসে প্রায় ৫ লাখ টাকার পরিবহন ব্যয় দেখানো হয়েছে। যেখানে আগের অধ্যক্ষ একই সময়ে খরচ করেছিলেন মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা, সেখানে আমিনুল ইসলামের ব্যয় ৩-৪ গুণ বেশি! তদন্ত বলছে—এই অঙ্ক বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না, বরং লুকিয়ে আছে ভুয়া ভাউচারের রহস্য। এতেই শেষ নয়—ব্যক্তিগত গাড়ির খরচও কলেজের নামে দেখানো হয়েছে, যেন সরকারি অর্থ আর ব্যক্তিগত খরচ এক অদ্ভুত সম্পর্কে জড়িয়ে গেছে!
আরও বড় বিস্ফোরণ—৭০ লাখ টাকার অদৃশ্য পরিবহন ফি। কলেজে শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো পরিবহন ব্যবস্থা না থাকলেও ভর্তি হওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে ২৫০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে পরিবহন ফি। এই খাত থেকে আদায় হয়েছে প্রায় ৭০ লাখ টাকা! অথচ এই অর্থ ব্যয়ের কোনো বৈধ খাত নেই—তদন্ত বলছে, পুরো অর্থই ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
সংখ্যার খেলায় আরও রহস্য— জ্বালানি খরচের হিসাব যেন এক রোমাঞ্চকর উপন্যাস। মাসে মাসে বাড়তে থাকা ব্যয়—৩৩ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকার ভাউচার—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, একটি শহরের ভেতরে চলা গাড়ি কীভাবে এত তেল খরচ করে? আর সবচেয়ে বিস্ময়কর—পূর্ববর্তী অধ্যক্ষ চার মাসে যেখানে ৩১১ লিটার অকটেন ব্যবহার দেখিয়েছেন, সেখানে আমিনুল ইসলাম তিন মাসেই দেখিয়েছেন ৯৫২ লিটার!
এখন কী হবে? সবকিছু এখন নির্ভর করছে তার দেওয়া জবাবের ওপর। যদি তা সন্তোষজনক না হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
অভিযোগ, অস্বীকার, তদন্ত—সব মিলিয়ে যেন এক টানটান নাটক। শেষ দৃশ্য এখনও বাকি… আর সেই দৃশ্যেই নির্ধারিত হবে—এটি কি শুধুই অভিযোগ, নাকি প্রমাণিত এক বিশাল কেলেঙ্কারির পরিণতি!
