গণপূর্ত বিভাগে কি তবে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ ঢাকতে ‘ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির’-এর মুখোশ পরানো হচ্ছে? নাকি রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাটের অভিযোগ থেকে বাঁচতে এখন গৃহপালিত গণমাধ্যমকে ঢাল বানানো হয়েছে?—এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে প্রশাসন ও সাধারণ ঠিকাদার মহলে।
সম্প্রতি “গণপূর্তে নিষিদ্ধ সংগঠনের বিষবৃক্ষ: ছাত্রলীগ নেতা হারুনের ১০ কোটি টাকার ‘টেন্ডার শিকার’” শিরোনামে একাধিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ-এর বিরুদ্ধে ভয়াবহ সব অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠে আসে। প্রকাশিত প্রতিবেদনের রেশ কাটতে না কাটতেই হঠাৎ করে একটি গৃহপালিত গণমাধ্যমে পাল্টা প্রতিবেদন—যেখানে অভিযুক্ত হারুন অর রশিদকে বানানো হলো নিষ্পাপ ‘যুধিষ্ঠির’!
ক্যাডার থেকে ‘ক্লিন ইমেজ’—নাটক কত দিনের ? অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, হারুন অর রশিদ বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক প্রভাবশালী নেতা হিসেবে ক্যাম্পাসে ‘ক্যাডার সংস্কৃতির’ প্রতীক ছিলেন। জুলাই–আগস্টের ছাত্র–জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র–জনতার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অথচ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজেকে হঠাৎ ‘বৈষম্যের শিকার’ ও ‘নির্যাতিত কর্মকর্তা’ সাজিয়ে নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ গণপূর্ত বিভাগে পদায়ন—এই নিয়োগ নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অতীতের দলীয় পোস্ট, মিছিল ও শুভেচ্ছা গ্রহণের ছবিই প্রমাণ করে—রাজনৈতিক পরিচয় অস্বীকার করা নিছক চোখে ধুলো দেওয়া ছাড়া কিছু নয়।
আতিক–হারুন সিন্ডিকেট: টেন্ডার লুটের খোলা হিসাব : প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গণপূর্তের আলোচিত কর্মকর্তা ও বর্তমানে ওএসডি আতিকুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেই পরিচিত হারুন অর রশিদ। অভিযোগ রয়েছে, আতিকুল ইসলামের স্ত্রীর মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাডরয়েড কনসাল্ট্যান্টস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারস’-কে সুবিধা দিতে পিপিআর রুল উপেক্ষা করে টেন্ডার ডকুমেন্টস লিক করা হয়।
বিশেষ করে ১০ মার্চ ২০২৫—একই দিনে ৬টি বড় প্রকল্পের টেন্ডার আহ্বান এবং অবিশ্বাস্যভাবে ছয়টির ছয়টিই পায় ওই পারিবারিক প্রতিষ্ঠান। কাগজে প্রতিযোগিতা, বাস্তবে একক দরদাতার নাটক—এভাবেই প্রায় ১০ কোটি ৬৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
রাজশাহী থেকে নারায়ণগঞ্জ—অনিয়মের ধারাবাহিকতা : নারায়ণগঞ্জই নয়, রাজশাহী গণপূর্তে কর্মরত থাকাকালেও হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে টেন্ডার ছাড়াই সরকারি ভবনের কাজ শুরুর অভিযোগ ওঠে। ৯ জুন প্রকাশিত জাতীয় দৈনিকে সে অনিয়মের তথ্য থাকলেও তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের আশ্রয়ে সে যাত্রা পার পেয়ে যান তিনি। অভিযোগ রয়েছে, শামীম আখতার নিজের দুর্নীতির বলয় টিকিয়ে রাখতে ছাত্রলীগ ঘরানার বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পরিকল্পিতভাবে পুনর্বাসন করেন —হারুন অর রশিদ তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
গৃহপালিত গণমাধ্যমে ‘যুধিষ্ঠির’ বানানোর অপচেষ্টা : অন্যদিকে, হারুন অর রশিদের পক্ষে প্রকাশিত পাল্টা প্রতিবেদনে অভিযোগ গুলোকে ‘মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও হয়রানিমূলক’ বলে দাবি করা হয়েছে। পিপিআর মেনে দরপত্র হয়েছে—এই একপাক্ষিক বক্তব্য দিয়েই সব অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ প্রতিবেদনে একই দিনে ৬টি টেন্ডার, একই প্রতিষ্ঠান, একই সিন্ডিকেট—এই মূল প্রশ্নগুলোর কোনো জবাব নেই। বরং সাংবাদিকদের ‘অসাধু’, ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ আখ্যা দিয়ে মামলা করার হুমকি দিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে স্তব্ধ করার কৌশলই স্পষ্ট হয়েছে।
হুমকি, মামলা ও প্রপাগান্ডা : প্রকাশিত অভিযোগের ভিত্তিতে জানা গেছে, হারুন অর রশিদ ও তার সহযোগীরা সংবাদপত্রের সম্পাদক, প্রকাশক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির হুমকি দিচ্ছেন। এমনকি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আইন কর্মকর্তা ও বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর নাম ব্যবহার করে মামলা অনুমোদনের প্রপাগান্ডাও চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জনমনে প্রশ্ন—রক্ত দিল কেন ছাত্ররা ? নারায়ণগঞ্জের সাধারণ ঠিকাদারদের প্রশ্ন, “হারুনের মতো নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা যদি আজও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে, তবে জুলাইয়ে ছাত্ররা রক্ত দিল কেন?” গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরেও অসন্তোষ দানা বাঁধছে। অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে হারানো গৌরব ফিরবে—কিন্তু তা কি এই ‘নিষিদ্ধ সিন্ডিকেট’ বহাল রেখে সম্ভব?
শেষ কথা : এখন দেখার বিষয়—অন্তর্বর্তী সরকার কি আদৌ হারুন–আতিক সিন্ডিকেটের বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলতে সাহসী পদক্ষেপ নেবে, নাকি ‘যুধিষ্ঠির’ বানানোর এই নাটক চলতেই থাকবে?
নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ হোক স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে—হুমকি, গৃহপালিত গণমাধ্যম আর প্রপাগান্ডা দিয়ে নয়।
