গণভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মেরামত-সাজসজ্জার দায়িত্বে ছিলেন; ২৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলার অনুমোদন। ফাইল ছবি
গণভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার মেরামত, সাজসজ্জা ও বিভিন্ন উন্নয়নকাজে বিপুল অর্থ ব্যয়ের সময় দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহ-আলম ফারুক চৌধুরীকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পর বর্তমানে বাগেরহাট গণপূর্ত বিভাগে কর্মরত এই প্রকৌশলী আবারও ঢাকায় পোস্টিং বাগিয়ে নিতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এর মধ্যেই আগ্রাবাদ কনভেনশন হলের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ফাহিম আহমেদ ও সাবেক উপবিভাগীয় প্রকৌশলী, বর্তমানে বাগেরহাট গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহ-আলম ফারুক চৌধুরীসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রোববার (৪ অক্টোবর) দুদক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, ক্ষমতার অপব্যবহার, নথি জালিয়াতি এবং সরকারি জমি ও ভাড়া বাবদ মোট ২৩ কোটি ৬৮ লাখ ৩৯ হাজার ২৬৮ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজেরা লাভবান হওয়া এবং অন্যকে লাভবান করার উদ্দেশ্যে ভুয়া রেকর্ডপত্র ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় ২৪ দশমিক ৯৬ শতক সরকারি জমি অবৈধভাবে দখলে রাখা এবং বকেয়া ভাড়া পরিশোধ না করে জালিয়াতি ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
ছয় বছর একই কর্মস্থলে
শাহ-আলম ফারুক চৌধুরী এর আগে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে প্রায় ছয় বছর দায়িত্ব পালন করেন বলে জানা গেছে। ওই সময়ে গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, ধানমন্ডি-৩২সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মেরামত ও উন্নয়নকাজ তার বিভাগের আওতায় ছিল।
অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় গণভবন ও ধানমন্ডি-৩২সহ বিভিন্ন স্থাপনার অনুষ্ঠান, প্যান্ডেল, সাজসজ্জা ও মেরামতকাজে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়। এসব কাজের মধ্যে নিয়মিত দরপত্র প্রক্রিয়া, ঠিকাদার নির্বাচন এবং বিল পরিশোধ নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগও ওঠে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রধান প্রকৌশলীর সার্কুলার ও নির্দেশনা অনুযায়ী যেসব কাজ এলটিএম পদ্ধতিতে করার কথা ছিল, তার বড় একটি অংশ ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে কাজ বণ্টনের অভিযোগও করা হয়েছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রায় ১০ কোটি টাকার কাজ দেখানো, কাজ সম্পন্নের সময়সীমা ও দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন এবং ই-জিপি পোর্টালের তথ্যের সঙ্গে অসঙ্গতির অভিযোগও রয়েছে। ২২ জুন ২০২৩ জুন ক্লোজিংয়ের সময়সীমার মধ্যে থাকলেও ২৮ জুন দরপত্র উন্মুক্ত করার বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট ই-জিপি নথি, কার্যাদেশ, পরিমাপ বই ও বিল-ভাউচার পর্যালোচনা করে বিষয়গুলো যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
গণভবনের সাজসজ্জা ও ঠিকাদারকেন্দ্রিক অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, গণভবন ও ধানমন্ডি-৩২সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বছরের বিভিন্ন সময় অনুষ্ঠান, প্যান্ডেল ও সাজসজ্জার নামে বিপুল অঙ্কের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। পিয়ারু সর্দার ও তার পরিবারের সদস্যদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন কাজ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
পিয়ারু সর্দারের নাতি তানভীরকে কোটি কোটি টাকার কাজ দেওয়ার অভিযোগও প্রতিবেদনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তানভীর তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী এ আরাফাতের সিআরআই (সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন)-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে এসব অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা হয়নি।
বাগেরহাটেও একই ধরনের অভিযোগ
বর্তমানে বাগেরহাট গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শাহ-আলম ফারুক চৌধুরী। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এপিপিভুক্ত বিভিন্ন কাজ এলটিএমের পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার মাধ্যমে অনিয়ম করা হয়েছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও প্রাক্কলন অনুমোদন ও এপিপি অনুমোদনের আগেই এলটিএমের পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বানের অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে বাগেরহাট গণপূর্ত বিভাগের একাধিক দরপত্র লাইভে রয়েছে বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
এ ক্ষেত্রে খুলনা গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আনোয়ারুল নজরুলের সহযোগিতার অভিযোগও করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কর্মস্থলে অনুপস্থিতির অভিযোগ, ঢাকায় তদবির
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলীর অভিযোগ, শাহ-আলম ফারুক চৌধুরী দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত কর্মস্থলে থাকেন না। অভিযোগ রয়েছে, সপ্তাহে এক-দুই দিনের বেশি বাগেরহাট অফিসে না থেকে তিনি ঢাকায় হেড অফিস ও মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে পোস্টিংয়ের তদবিরে সময় দিচ্ছেন।
বাগেরহাট গণপূর্ত বিভাগের সিসিটিভি ফুটেজ ও উপস্থিতির রেকর্ড পর্যালোচনা করলে এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
এ ছাড়া তিনি ইতোমধ্যে কানাডায় পাড়ি জমিয়েছেন বলেও একটি সূত্রের দাবি রয়েছে। তবে এ তথ্যের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
সম্পদের পাহাড়ের অভিযোগ
শাহ-আলম ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে ঢাকায় বাড়ি ও একাধিক ফ্ল্যাট, কুমিল্লায় প্রায় ২৩ একর জমি এবং বিভিন্ন ব্যাংকে নামে-বেনামে বিপুল অর্থ থাকার অভিযোগও রয়েছে। অল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ তুলে তার সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন একই গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে থাকার সুযোগে তিনি প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে বিভিন্ন উন্নয়ন ও মেরামতকাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দুদকের মামলার অনুমোদনের পরও ঢাকায় ফেরার তৎপরতা?
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—২৩ কোটি ৬৮ লাখ ৩৯ হাজার ২৬৮ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের মামলার অনুমোদনের পরও শাহ-আলম ফারুক চৌধুরী ঢাকায় পোস্টিং নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ।
অভিযোগকারীদের দাবি, কুমিল্লায় তার নিজস্ব বাড়ি হওয়ায় বিভিন্ন প্রভাবশালী মহল ও পরিচিতজনের মাধ্যমে তদবির চালানোর পাশাপাশি অর্থের বিনিময়ে পোস্টিং বাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তবে এসব তদবির ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্য ও নির্ভরযোগ্য নথি পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ।
দুদকের মামলার অনুমোদন এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা একের পর এক অভিযোগের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে—দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত একজন প্রকৌশলী কীভাবে আবারও রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ফেরার চেষ্টা করছেন?
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে তার সম্পদের হিসাব, পূর্বের কর্মস্থলের ই-জিপি নথি, ঠিকাদারদের কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার, উপস্থিতির রেকর্ড এবং ঢাকায় পোস্টিংয়ের জন্য করা তদবিরের বিষয়গুলো তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
