অন্ধকার ঘরে চোখ বাঁধা এক মানুষ। হাত-পা বাঁধা। পরিবারের আর্তনাদ, সন্তানের কান্না, স্ত্রীর অনিদ্রা রাত—সবকিছুকে পেছনে ফেলে বারবার মৃত্যু-ভয়ের মুখ থেকে ফিরে আসা সেই মানুষটি আজ সংসদ সদস্য। আর এখন জোর গুঞ্জন—তিনি হতে পারেন নতুন সরকারের মন্ত্রীও।
তিনি আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন—কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক, মাদারীপুর-৩ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সম্ভাব্য মন্ত্রিসভায় তার নাম ঘুরপাক খাচ্ছে জোরেশোরে। ত্যাগ-তিতিক্ষার দীর্ঘ অধ্যায় পেরিয়ে উঠে আসা এই নেতার জন্য মাদারীপুরে এখন আবেগ আর প্রত্যাশার ঢেউ।
গুমের অন্ধকারে দুইবার-
সূত্র বলছে, ২০১৪ সালে টানা তিন মাস ১৭ দিন এবং ২০১৮ সালে আরও তিন দিন—দুই দফা গুম ছিলেন খোকন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাকে প্রথমে ধানমন্ডির মেট্রো শপিং মল থেকে, পরে রমনা এলাকার একটি হোটেল থেকে তুলে নেওয়া হয়। চোখ বেঁধে, হাত-পা বেঁধে অমানসিক নির্যাতনের পর একবার ফেলে রাখা হয় ফরিদপুরের কানাইপুর মহাসড়কে, আরেকবার রেখে যাওয়া হয় রমনা থানায়।
সে সময় তার পরিবার দিন গুনেছে আতঙ্কে। জীবিত না মৃত—এই অনিশ্চয়তার দহন বয়ে বেড়িয়েছে প্রিয়জনেরা। দেড় শতাধিক মামলার আসামি হয়েছেন, বহুবার কারাবরণ করেছেন। তবুও থামেননি। ভোটের রায়ে প্রত্যাবর্তন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাদারীপুর-৩ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ৯৬ হাজার ১২৮ ভোট পেয়ে জয়ী হন তিনি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা রফিকুল ইসলাম পান ৮৪ হাজার ৬৪৬ ভোট। ১১ হাজার ৪৮২ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে খোকন যেন ব্যক্তিগত লড়াইয়েরও এক ঐতিহাসিক জবাব দিয়েছেন।
৩ লাখ ৮৭ হাজার ৮০৬ ভোটারের এই আসনে এখন একটাই আলোচনা—“ত্যাগের স্বীকৃতি কি মিলবে?” কালকিনি, ডাসার ও সদর উপজেলার ইউনিয়নগুলোতে নেতাকর্মীরা প্রহর গুনছেন—তাদের ‘নির্যাতিত নেতা’ কি এবার মন্ত্রীর আসনে বসবেন?
আদর্শের পথে অবিচল-
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক হিসেবে ১৯৯৮ সালে রাজনীতিতে পথচলা শুরু খোকনের। তিনি বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শ বুকে ধারণ করেই রাজনীতিতে এসেছি। বিরোধী দলে থেকে নির্যাতন সহ্য করেছি, গুম হয়েছি, জেল খেটেছি। কিন্তু দল ও জনগণের আস্থা হারাইনি। যদি দল আমাকে মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব দেয়, তবে সেটিকে মানুষের সেবার অঙ্গীকার হিসেবেই গ্রহণ করবো।
ডাসার উপজেলার পশ্চিম খান্দুলী গ্রামের এই সন্তান একজন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যানের ছেলে। পরিবারে স্ত্রী ও দুই মেয়ে—যারা তার প্রতিটি সংগ্রামের নীরব সাক্ষী।
ত্যাগের স্বীকৃতি কি মিলবে?
মাদারীপুর-৩ এখন শুধু একটি নির্বাচনী আসন নয়—এটি যেন এক প্রতীক। অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার গল্প। গুম, নির্যাতন, মামলা, কারাবরণ—সব পেরিয়ে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছানো এক রাজনীতিকের নাম।
প্রশ্ন এখন একটাই—দলের প্রস্তাবিত মন্ত্রিসভায় কি জায়গা হবে এই ত্যাগী নেতার?
মাদারীপুরের জনপদে প্রতিধ্বনি উঠছে—“যে অন্ধকার জয় করেছে, সে-ই তো আলো ছড়াবে।
