বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় গতকাল শুক্রবার প্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে উদ্বোধন শুরু হয় ‘জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলন’। ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলন। শুক্রবার জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আয়োজিত এ সম্মেলন বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের এক উন্মুক্ত মঞ্চে পরিণত হয়েছে। এটি জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ-এর ৪৪তম বার্ষিক অধিবেশন।
এবারের আয়োজন অংশগ্রহণের দিক থেকে আরও বিস্তৃত। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাত শতাধিক শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠক এতে অংশ নিয়েছেন। ‘আমি মারের সাগর পাড়ি দেব’ গানের মাধ্যমে সম্মেলনের সূচনা হয়। সঞ্চালনায় ছিলেন নাট্যনির্দেশক ত্রপা মজুমদার।
উদ্বোধনী পর্বে ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সংস্কৃতিকে ‘মায়ের’ সঙ্গে তুলনা করে বলেন, সংস্কৃতি মানুষকে লালন করে, আশ্রয় দেয় এবং চিন্তার দুয়ার উন্মুক্ত করে। তিনি বলেন, সভ্যতা যদি পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোয় আবদ্ধ হয়, তবে সংস্কৃতিই মানবিকতার শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠে।
তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর দর্শনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাই রবীন্দ্রচেতনার মূল শক্তি। তাঁর মতে, সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা মানে সমাজকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া। সমকালীন বাস্তবতায় মৌলবাদী প্রবণতা ও সংস্কৃতিবিরোধী মনোভাবকে তিনি গভীর সংকটের লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
শিক্ষাব্যবস্থার বিভাজন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বহুমুখী শিক্ষা কাঠামো বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গানের শিক্ষক নিয়োগ বাতিলের উদ্যোগকে তিনি ‘মনুষ্যত্ববিরোধী’ আখ্যা দিয়ে এর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
পরিষদের সহসভাপতি বুলবুল ইসলাম দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, মানবিকতার সংকট এখন বৈশ্বিক। সাধারণ সম্পাদক লিলি ইসলাম মনে করেন, বিশ্বায়নের চাপে শিকড় হারানোর এই সময়ে রবীন্দ্রচর্চা আত্মপরিচয় পুনর্গঠনের শক্তি হতে পারে।
সভাপতি মফিদুল হক সংগীত শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ওপর জোর দিয়ে বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সংগীত যুক্ত না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সাংস্কৃতিক ভিত্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
দুই দিনের এ আয়োজনে সংগীত, আবৃত্তি, নৃত্য, গীতি আলেখ্য ও আলোচনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সমাপনী দিন আজ শনিবার সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার-এ পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিনের কার্যক্রম শুরু হবে। পরে অনুষ্ঠিত হবে প্রতিনিধি সম্মেলন ও ‘বিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও সংগীত’ শীর্ষক সেমিনার।
সেমিনারে অংশ নেবেন শিক্ষাবিদ সৈয়দ আকরম হোসেন। সংস্কৃতিচর্চায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হবে রবীন্দ্রপদক। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন নাট্যব্যক্তিত্ব ফেরদৌসী মজুমদার।
উল্লেখ্য, ১৯৭৯ সালে প্রয়াত শিল্পী জাহিদুর রহিম-এর স্মৃতিকে ধারণ করে শুরু হওয়া এ উদ্যোগ এখন জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে সংগঠনটির ৮২টি সক্রিয় শাখা দেশজুড়ে সাংস্কৃতিক চর্চাকে এগিয়ে নিচ্ছে।
