বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের (নিষিদ্ধঘোষিত) সভাপতি জুয়েল হাসানের মা দেলোয়ারা একরাম। ছবি: সংগৃহীত
কারাগারের ফটকে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো স্ত্রী আর শিশু সন্তানের নিথর দেহ দেখেছিলেন জুয়েল হাসান সাদ্দাম। সেই দৃশ্য এখনো তাড়া করে ফেরে তাঁর পরিবারকে। উচ্চ আদালত থেকে জামিন মিললেও, সেই খবরে নেই স্বস্তি—নেই কোনো আনন্দ। বরং শোক আর হাহাকারের ভার আরও গভীর হয়েছে।
সাদ্দামের মা দেলোয়ারা একরামের কণ্ঠে শুধুই আক্ষেপ আর ক্ষোভ। চোখের জল মুছতে মুছতে তিনি বলেন, স্ত্রী-সন্তান বেঁচে থাকতে ছেলের জামিন হলো না। আর এখন জামিন দিয়ে কী হবে? বাড়ি এসে তো শুধু কবর দেখবে!’
তিনি জানান, একের পর এক মামলার বেড়াজালে পড়ে ছেলেকে মুক্ত করার চেষ্টা করেছেন বারবার।
‘এক মামলায় জামিন হয়, আরেক মামলায় আবার ধরে। স্ত্রী-সন্তান মরার একদিন আগেও যদি জামিন পেত, তাহলে হয়তো এই অভিশপ্ত দিনটা আমাদের দেখতে হতো না,’—কথা বলতে বলতে ভেঙে পড়েন তিনি।
দেলোয়ারা একরাম বলেন, এখন জামিন হওয়া আর না হওয়া—দুটোই সমান। তবু জামিন হয়েছে, ভালো কথা। কিন্তু এই মুক্তি তো কোনো সুখ নিয়ে আসবে না।’
স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মৃত্যুতে প্যারোলে মুক্তি না পাওয়াকে ‘অমানবিক’ আখ্যা দিয়েছেন সাদ্দামের শ্বশুর, জাতীয় পার্টির নেতা রুহুল আমিন হাওলাদার। তিনি রাষ্ট্রের কাছে বিচার দাবি করে বলেন, এই ঘটনায় মানবিকতার কোনো দৃষ্টান্ত রাখা হয়নি।’
প্যারোলে মুক্তির জন্য আবেদন করা সাদ্দামের মামা হেমায়েত উদ্দিন বলেন, আমরা চেষ্টা করেছি, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। এখন এই জামিনের জন্য ধন্যবাদ জানানো ছাড়া কিছু করার নেই।
সাদ্দামের শ্যালক শাহনেওয়াজ আমিন শুভ আরও কঠোর ভাষায় বলেন, এই জামিন দিয়ে কী হবে? সবই নাটকীয়তা। মানুষের কষ্টের কোনো মূল্য নেই।’
সোমবার হাইকোর্টের বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমেদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ সাদ্দামের ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করেন। তাঁর পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা।
উল্লেখ্য, বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা জুয়েল হাসান সাদ্দাম নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের স্থানীয় সভাপতি ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আত্মগোপনে যান। পরে ২০২৫ সালের ৫ এপ্রিল গোপালগঞ্জ থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এরই মধ্যে শুক্রবার দুপুরে তাঁর স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা ওরফে স্বর্ণালী (২২) এবং ৯ মাস বয়সী ছেলে সেজাদ হাসান নাজিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয় বাড়ি থেকে। পরদিন ময়নাতদন্ত শেষে জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়। স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর পরও প্যারোলে মুক্তি না দেওয়ায় দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
আজ জামিন পেয়েছেন সাদ্দাম। কিন্তু সেই জামিন কোনো আনন্দ বয়ে আনেনি—বরং একটি প্রশ্নই রেখে গেছে: যে ঘরে অপেক্ষা করছে শুধু কবর আর শূন্যতা, সেখানে এই মুক্তির মানে কী?
