শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

জাল অভিজ্ঞতা সনদে চাকরি, এখন ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ নজরুল ইসলাম

স্টাফ রিপোর্টার
অক্টোবর ২৩, ২০২৬ ২:১৫ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সিরাজুলের ২২ বছরের পদ দখলের পর নতুন কর্মকর্তার নিয়োগেও জালিয়াতির অভিযোগ, প্রশ্নবিদ্ধ নগর পরিকল্পনা বিভাগের স্বচ্ছতা। ফাইল ছবি

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে (ডিএসসিসি) দুর্নীতি ও জালিয়াতির যেন এক অভয়ারণ্য গড়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া ও জাল সনদে চাকরি হাসিল এবং অবৈধভাবে শীর্ষ পদ দখল করে রাখার ঘটনা এবার আর একক কোনো ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা পরিণত হয়েছে ধারাবাহিক প্রশাসনিক অনিয়মের এক উদ্বেগজনক চিত্রে। সম্প্রতি জাল শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা সনদের মাধ্যমে দীর্ঘ ২২ বছর প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের পদ দখলে রাখার অভিযোগে মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামকে সরিয়ে দেওয়ার পর, একই পদে চলতি দায়িত্ব পাওয়া নতুন কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধেও ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদে চাকরিতে প্রবেশের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে এসেছে।

সিরাজুলের বিদায়, অনিয়মের দীর্ঘ ইতিহাস

২০০৪ সালে তৎকালীন অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের আকস্মিক মৃত্যুতে পদটি শূন্য হয়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা ছাড়াই পদটি বাগিয়ে নেন স্থপতি হিসেবে কর্মরত মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম। পরবর্তী সময়ে অভিযোগ ওঠে, তার মূল পদ—স্থপতি হিসেবে চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রেও জাল শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা সনদ ব্যবহার করা হয়েছিল।

সাময়িকভাবে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পদায়ন করা হলেও, ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে মোটা অঙ্কের ঘুষ এবং প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘ ২২ বছর পদটি আঁকড়ে রাখেন তিনি—এমন অভিযোগ রয়েছে। এ সময়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও নানা প্রশাসনিক দুর্নীতির অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে।

গণমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন, দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তদন্তের মুখে অবশেষে তাকে পদচ্যুত করা হয়। তবে অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় জালিয়াতির অভিযোগ সামনে আসার পরও সিটি কর্পোরেশন বা মন্ত্রণালয় থেকে তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক কিংবা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না।

নতুন প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ, সাভার পৌরসভার অভিজ্ঞতা সনদ নিয়ে প্রশ্ন

সিরাজুল ইসলামকে সরিয়ে দেওয়ার পর ডিএসসিসির নগর পরিকল্পনা বিভাগে সৃষ্ট সংকট নিরসনে যোগ্য কর্মকর্তা নিয়োগের প্রত্যাশা করেছিলেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু গত ৫ সেপ্টেম্বর ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ মো. নজরুল ইসলামকে প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের চলতি দায়িত্ব দেয়। তিনি একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে তার মূল পদেও বহাল রয়েছেন।

অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, নতুন এই প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদের চাকরিতে প্রবেশের ভিত্তিও ছিল ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদ। অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নিয়োগবিধি অনুযায়ী, নগর পরিকল্পনাবিদ পদে আবেদনের জন্য স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি’র পাশাপাশি কোনো সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ‘সহকারী নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনাবিদ’ হিসেবে ন্যূনতম পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক ছিল।

নজরুল ইসলাম চাকরির আবেদনের সময় সাভার পৌরসভায় ওই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন বলে একটি সনদপত্র দাখিল করেন। কিন্তু সাভার পৌরসভার নথিপত্র ও রেকর্ড যাচাইয়ের বরাতে দাবি করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সময়ে সেখানে ‘সহকারী নগর পরিকল্পনাবিদ’ কিংবা ‘সহকারী অঞ্চল পরিকল্পনাবিদ’ নামে কোনো পদই ছিল না। এমনকি নজরুল ইসলাম সাভার পৌরসভায় অন্য কোনো পদেও চাকরি করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসব তথ্য সত্য হলে, তার দাখিল করা অভিজ্ঞতা সনদের বৈধতা এবং ওই সনদের ভিত্তিতে চাকরিতে প্রবেশের বিষয়টি গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়ে। তবে অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নিয়োগ নথি, সনদের সত্যায়ন এবং নজরুল ইসলামের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক পরিচয় ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, কীভাবে নিয়োগ পেলেন নজরুল?

অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ উঠেছে, নিয়োগ প্রক্রিয়ার শুরুতেই নজরুল ইসলামের অভিজ্ঞতা সনদ নিয়ে অনিয়মের বিষয়টি সামনে এসেছিল। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা পড়ায় তার নিয়োগপত্র দীর্ঘদিন ঝুলে ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছাত্রলীগের পরিচয় ব্যবহার এবং মোটা অঙ্কের অনৈতিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে তিনি প্রশাসনিক বাধা দূর করে চাকরিতে যোগদানের সুযোগ পান। তবে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার কিংবা অর্থ লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে সংশ্লিষ্ট নথি, অর্থের পরিমাণ বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রকাশ করা প্রয়োজন।

অভিযোগের যথাযথ তদন্ত না হলে জাল সনদের মাধ্যমে চাকরি পাওয়ার বিষয়টি আড়ালেই থেকে যেতে পারে। আর সেই নিয়োগের ভিত্তিতে বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ নগর পরিকল্পনার শীর্ষ পদে চলতি দায়িত্ব পাওয়ায় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নগর পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি সংকট, ভোগান্তির আশঙ্কা নগরবাসীর

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অবকাঠামো উন্নয়ন, ভূমি ব্যবহার, সড়কব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ নগরায়ণের পরিকল্পনায় নগর পরিকল্পনা বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ বিভাগের নেতৃত্বে প্রয়োজন পেশাগত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা।

অভিযোগ রয়েছে, সিরাজুল ইসলাম দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা ছাড়াই পদটি দখলে রাখায় পরিকল্পিত নগর গঠনে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে নগর উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার ওপর। যদিও এ ধরনের ঘাটতির সঙ্গে নির্দিষ্ট কর্মকর্তার দায়িত্ব ও সিদ্ধান্তের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে প্রকল্প, পরিকল্পনা এবং প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনা জরুরি।

পরপর দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা সনদ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ ওঠায় ডিএসসিসির নিয়োগব্যবস্থা, যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পেশাদার ও যোগ্য কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে বিতর্কিত নিয়োগের মাধ্যমে নগর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বণ্টন করা হলে প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ও জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি

সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে নজরুল ইসলামের চাকরিতে প্রবেশের সময় দাখিল করা শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা সনদ যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে সাভার পৌরসভার সংশ্লিষ্ট সময়ের নিয়োগবিধি, জনবল কাঠামো, চাকরির রেকর্ড এবং ডিএসসিসির নিয়োগসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

সিরাজুল ইসলামের নিয়োগ ও দীর্ঘদিন পদে বহাল থাকার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনা উচিত। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

নগর পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব কিংবা অর্থ লেনদেনের অভিযোগ নয়—যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও স্বচ্ছ যাচাই-বাছাইকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য এবং ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য, নিয়োগ নথি ও স্বাধীন তদন্তের ফলাফল বিবেচনা করা জরুরি।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।