মো. নাজির আহমেদ রিপন চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদানের পর থেকেই জেলার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের মুখে মুখে। নানা সূত্রে পাওয়া তথ্য বলছে, সরকারি সেবার গুরুত্বপূর্ণ এই দপ্তর যেন ধীরে ধীরে স্বচ্ছতার জায়গা হারিয়ে এক ধরনের “অঘোষিত লেনদেনের কেন্দ্র”-এ রূপ নিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, নিয়মের বাইরে গিয়ে দলিল প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়, অধীনস্থ কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং ঘুষের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছেন তিনি। সদর সাব-রেজিস্ট্রার ছাদেকুর রহমানসহ অফিসের সহকারী, মোহরার ও পিয়নদেরও এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে।
*প্রতিটি দলিলে ‘অঘোষিত ফি’ — অভিযোগে ঘুষের নির্দিষ্ট হার।
*সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ জমা দেওয়া একাধিক অভিযোগে বলা হয়েছে—
*প্রতিটি দলিল সম্পাদনে অতিরিক্ত ২০০ টাকা, নকল দলিলে ১৫০ টাকা।
*অডিটের সময় ২–৩ লাখ টাকা,
আকস্মিক পরিদর্শন ঠেকাতে ৫০ হাজার টাকা।
*অতিরিক্ত দায়িত্ব পেতে ২–২.৫ লাখ টাকা।
*কাজী রেজিস্ট্রারদের কাছ থেকেও মাসিক ১০ হাজার টাকা।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব অর্থ আদায়ের ফলে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে। চাকরির নিরাপত্তার ভয়ে অনেক কর্মকর্তা নীরব থাকছেন বলেও জানা গেছে। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি : অর্থ না দিলে কাজ এগোয় না’
স্থানীয়দের ভাষ্য, দলিল করা বা নকল তুলতে গিয়ে নিয়মিত অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ দুটোরই অপচয় হচ্ছে। অনেকে বলছেন, ন্যায্য প্রক্রিয়ায় কাজ সম্পন্ন করা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ— সরকারি ফি দেওয়ার পরও আলাদা টাকা না দিলে ফাইল এগোয় না। বাধ্য হয়ে দিতে হয়।
সম্পদের বিস্তার নিয়ে প্রশ্ন-
অভিযোগে আরও উঠে এসেছে, সরকারি বেতনের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন সম্পদের মালিক হয়েছেন এই কর্মকর্তা। স্থানীয় সূত্রে যেসব সম্পদের কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে— ঢাকার লালবাগ ও মোহাম্মদপুরে বাড়ি, ধানমন্ডিতে ফ্ল্যাট, নিউমার্কেটে পাঁচটি দোকান, ইসলামপুরে কাপড়ের ব্যবসা, কেরানীগঞ্জ ও কালীগঞ্জে মার্কেট, দুবাইয়ে ব্যবসা ও সেকেন্ড হোম। এই সম্পদের উৎস নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ভয় ও প্রভাবের অভিযোগ- অধীনস্থ কর্মচারীদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি, অনুগতদের সুবিধা দেওয়া এবং ভিন্নমত পোষণকারীদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়তে হয়—এমন অভিযোগও এসেছে প্রশাসনিক সূত্রে। ফলে অফিসে স্বাভাবিক কাজের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
১৫টির বেশি অভিযোগ, তবুও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
দুদকে একাধিক অভিযোগ জমা হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এমন দাবি অভিযোগকারীদের। তদন্তের অগ্রগতি প্রকাশ না হওয়ায় জনমনে হতাশা বাড়ছে।
আস্থা সংকটে প্রশাসন-স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিকদের মতে, এ পরিস্থিতি শুধু একটি দপ্তরের সমস্যা নয়; এটি জেলা প্রশাসনের প্রতি আস্থাকেও নড়বড়ে করে দিচ্ছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে সরকারি সেবার মান প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপের দাবি-
স্থানীয়দের অভিন্ন দাবি—স্বচ্ছ তদন্ত, সম্পদের উৎস যাচাই এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছাড়া পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। তারা মনে করছেন, উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপই পারে এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও সেবা ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনতে।
উল্লেখ্য যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ শুধু আর্থিক অনিয়মের গল্প নয়; এটি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, ন্যায়বিচার এবং নাগরিক সেবার স্বচ্ছতার প্রশ্ন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি—এমনটাই বলছেন স্থানীয়রা।
