বৃহস্পতিবার, ১৫ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দুর্নীতির দায়ে পদাবনতি, এবার ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পের পরিচালক আরিফুল ইসলাম জুয়েল

নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবর ১৪, ২০২৬ ১১:০৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ভবন নির্মাণে অনিয়মের তদন্তে শাস্তি, চার বছর পদোন্নতি স্থগিত—পরে শাস্তি বাতিল ও পদোন্নতি; বিএনপির নেতাদের চিঠিতে তদবির বাণিজ্যের অভিযোগ, এবার খুলনা ওয়াসার মেগা প্রকল্পের দায়িত্বে। ফাইল ছবি

ভবন নির্মাণে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় একসময় নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদাবনতি হয়েছিল তাঁর। একই সঙ্গে চার বছরের জন্য স্থগিত করা হয়েছিল পদোন্নতি। কর্মস্থলে দেরিতে উপস্থিত হওয়া, দায়িত্ব পালনে অনিয়ম ও সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগেও একাধিকবার পেয়েছেন কারণ দর্শানোর নোটিশ। এমনকি তদবির বাণিজ্য এবং বিভিন্ন দপ্তরের নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে চিঠি দিয়েছিলেন খুলনা মহানগর বিএনপির শীর্ষ নেতারা।

এত অভিযোগ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অতীত পেরিয়ে এবার খুলনা ওয়াসার ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের (ফেজ-২) প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) দায়িত্ব পেয়েছেন প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জুয়েল। বিএনপি-সমর্থিত প্রকৌশলীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (অ্যাব) খুলনা জেলা কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক তিনি। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খুলনা ওয়াসায় বদলি হয়ে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে যোগ দেন তিনি। এরপর দুই দফায় প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পরিবর্তনের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পের দায়িত্ব তাঁর হাতে এসেছে।

তবে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে আরিফুল ইসলাম জুয়েলের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আগে তাঁকে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। পরে সেই শাস্তি প্রত্যাহার ও পদোন্নতির মাধ্যমে তাঁর ত্যাগের মূল্যায়ন করা হয়েছে।

ভবন নির্মাণে অনিয়মের তদন্তে পদাবনতি

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় একাডেমিক ভবন নির্মাণের পর হাঁটাচলার সময় ভবনটিতে কম্পন অনুভূত হতে থাকে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) প্রবীণ শিক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি ভবনের ছাদের চারটি স্থানে স্ল্যাব কেটে পরীক্ষা করে নির্মাণকাজে বড় ধরনের অনিয়মের তথ্য পায়। তদন্তে দেখা যায়, নকশা অনুযায়ী ছাদে কংক্রিটের পুরুত্ব সাড়ে ৫ ইঞ্চি থাকার কথা থাকলেও কোনো কোনো স্থানে তা ছিল মাত্র ৩ ইঞ্চি, আবার কোথাও ৩ দশমিক ৭৫ ইঞ্চি। এতে ভবনের স্থায়িত্ব ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তদন্তে আরও বলা হয়, ছাদ ঢালাইয়ের সময় আরিফুল ইসলাম জুয়েল বিদেশে অবস্থান করছিলেন। দেশে ফিরে তাঁর অনুপস্থিতিকালীন নির্মাণকাজের এমবি (মেজারমেন্ট বুক) যাচাই না করেই তাতে স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধে সহযোগিতার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।

নির্মাণকাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধেও অনিয়মে বাধা না দেওয়া এবং ঠিকাদারের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় সাতজনকে শাস্তি দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে জুয়েলকে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে পদাবনতি দিয়ে সহকারী প্রকৌশলী করা হয়। পাশাপাশি চার বছরের জন্য তাঁর পদোন্নতি স্থগিত করা হয়েছিল।

শাস্তি বাতিল, পদোন্নতি—তারপর প্রেষণে ওয়াসায়

সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, অ্যাবের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও বর্তমান রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলামের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত আরিফুল ইসলাম জুয়েল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্যসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকও অ্যাবের সদস্য বলে জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে জুয়েলের বিরুদ্ধে নেওয়া আগের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। ২০২৫ সালে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপপ্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। পরে খুলনা ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে প্রেষণে পাঠানো হয় তাঁকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কর্মকর্তাকে অন্য সংস্থায় এভাবে প্রেষণে পাঠানোর ঘটনা হিসেবে এটিকে প্রথম বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো উল্লেখ করেছে।

তবে শাস্তি বাতিল, পদোন্নতি ও প্রেষণে নিয়োগের ক্ষেত্রে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মহানগর বিএনপির চিঠিতে তদবির বাণিজ্যের অভিযোগ

একাধিক সূত্রের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি ও অ্যাবের সাংগঠনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের বদলি ও পদায়নে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেন জুয়েল। এ নিয়ে অভিযোগ বাড়তে থাকায় ২০২৫ সালের ২৬ জুন অ্যাবের সভাপতি ও আইইবির চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলামের কাছে চিঠি দেন খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি এস এম শফিকুল আলম মনা ও সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন।

চিঠিতে বলা হয়, গত সাত-আট মাস ধরে একের পর এক অভিযোগ আসছে যে দলের পদ ব্যবহার করে আরিফুল ইসলাম জুয়েল কুয়েটসহ বিভিন্ন প্রকৌশল দপ্তরে গিয়ে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন এবং নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছেন। বিভিন্ন অফিসে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তদবির করার অভিযোগও তোলা হয়। এসব কর্মকাণ্ডে দলের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

চিঠিতে তাঁর অ্যাবের সাধারণ সম্পাদক পদ বাতিলের সুপারিশও করা হয়েছিল।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জুয়েল। তাঁর ভাষ্য, রাজনৈতিকভাবে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা ও শাস্তি দেওয়া হয়। অভ্যুত্থানের পর সেই শাস্তি প্রত্যাহার ও আমাকে পদোন্নতি দিয়ে ত্যাগের মূল্যায়ন করা হয়েছে।

ডিজিটাল হাজিরায় অনিয়মের অভিযোগ

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকাকালে সময়মতো অফিসে উপস্থিত না হওয়া এবং সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগেও জুয়েল একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ পেয়েছেন বলে জানা গেছে। বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিভিন্ন সময়ে তাঁকে একাধিকবার শোকজ করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল হাজিরার ফিঙ্গারপ্রিন্ট রেকর্ডের বরাত দিয়ে সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে পরবর্তী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৫৪ কর্মদিবসের প্রতিটিতেই তিনি দেরিতে অফিসে উপস্থিত হন। এর মধ্যে ৩০ দিন নির্ধারিত সময়ের আগেই অফিস ত্যাগ করেন। ওই রেকর্ড অনুযায়ী, এ সময়ে তাঁর দৈনিক গড় কর্মঘণ্টা ছিল ২ দশমিক ৮৬ ঘণ্টা।

এ ঘটনায় গত ৪ মার্চ তাঁকে আবারও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।

খুলনা ওয়াসায় যোগদানের পরও নিয়মিত কার্যালয়ে উপস্থিত না হওয়া এবং উপব্যবস্থাপনা পরিচালকের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দুই দফায় দায়িত্ব পরিবর্তন, শেষ পর্যন্ত পিডি জুয়েল

খুলনা ওয়াসার পানি সরবরাহ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের রুটিন দায়িত্বে ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম। গত ২৬ এপ্রিল তাঁকে ওই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, অ্যাবের কেন্দ্রীয় নেতাদের মাধ্যমে তদবির করে জুয়েলই তাঁকে সরানোর উদ্যোগ নেন।

সূত্রের দাবি, গত ২৮ জুন খুলনা ওয়াসায় যোগ দেওয়ার পর থেকেই ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্পের পরিচালক হওয়ার জন্য তৎপরতা শুরু করেন জুয়েল। তবে গত ২৯ জুলাই প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফিরোজ শাহকে।

এরপর বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ এবং মন্ত্রণালয়ে তদবিরের মাধ্যমে ফিরোজ শাহকেও ওই দায়িত্ব থেকে সরানোর চেষ্টা করেন জুয়েল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে শেষ পর্যন্ত প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পান তিনি।

প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পরিবর্তনের বিষয়ে খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফিরোজ শাহ বলেন, পিডি নিয়োগ মন্ত্রণালয়ের বিষয়। এখানে আমার কিছু বলার নেই।

তবে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত কী প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছে, কার সুপারিশে দায়িত্ব পুনর্বণ্টন করা হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও প্রশাসনিক বিবেচনার ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

‘রাজনৈতিক বিবেচনায় দণ্ডিতরা জায়গা পেলে অবস্থা আরও নাজুক হবে’

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, সুপেয় পানি সরবরাহের ব্যর্থতা, বিল ভোগান্তি ও সড়ক খোঁড়াখুঁড়িসহ সব মিলিয়ে ওয়াসা অর্থব্যর্থ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এটিকে সচল করতে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা দরকার। রাজনৈতিক বিবেচনায় দণ্ডিতরা জায়গা পেলে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থা আরও নাজুক হবে।

খুলনা ওয়াসার মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষতার প্রশ্নটি তাই সামনে এসেছে। অতীতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, পরবর্তী সময়ে তা বাতিল, পদোন্নতি, প্রেষণে নিয়োগ এবং একাধিকবার প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পরিবর্তনের ঘটনাগুলো নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে।

অন্যদিকে, আরিফুল ইসলাম জুয়েলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের বাইরে নতুন কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে, তাঁর বিরুদ্ধে আগের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল এবং প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনার মাধ্যমে বিষয়গুলোর পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।