শুক্রবার, ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দেড় কোটি ঘুষে ১৫ কোটি বিল! বরিশাল গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সালের বিরুদ্ধে মহাজালিয়াতির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবর ২৩, ২০২৬ ১:৪১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

৫০ লাখ টাকার তামার পাইপ চুরির ‘নাটক’, বদলির আদেশ অমান্য ও সরকারি বাংলোয় পুকুর খননের অভিযোগ। নৌকার ব্যাজ আড়াল করে নতুন রূপে নেভী কোর্ট পড়া প্রকৌশলী বেপরোয়া ফয়সাল। ফাইল ছবি

বরিশাল গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি ও প্রশাসনিক অনিয়মের একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদারদের কাছ থেকে দেড় কোটি টাকা ঘুষ নিয়ে কাজ শেষ হওয়ার আগেই ১৫ কোটি টাকার বিল অনুমোদন, নির্মাণাধীন বরিশাল ক্যান্সার হাসপাতালে ৫০ লাখ টাকার তামার পাইপ চুরির অভিযোগে সাজানো ঘটনার আশ্রয় এবং সরকারি বদলির আদেশ অমান্য করে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার মতো অভিযোগে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন এই প্রকৌশলী।

অভিযোগের এখানেই শেষ নয়। সরকারি জ্বালানি ব্যবহার করে ব্যক্তিগত কাজে খুলনায় যাতায়াত, বরিশাল গণপূর্তের শতবর্ষী ঐতিহাসিক বাংলোর আঙিনায় রাতের আঁধারে পুকুর খনন এবং সরকারি বাসভবনে বসে দাপ্তরিক নথিতে স্বাক্ষর করার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। একসময় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আমির হোসেন আমুর আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে বরিশাল গণপূর্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠা এই প্রকৌশলী সরকার পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করে আবারও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

দেড় কোটি ঘুষে ১৫ কোটি টাকার অগ্রিম বিল!

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত অভিযোগ অনুযায়ী, টেন্ডারের শর্ত লঙ্ঘন করে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ফয়সাল আলমের বিরুদ্ধে। কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই দুই ঠিকাদারকে মোট ১৫ কোটি টাকা অগ্রিম বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দেড় কোটি টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগকারী ঠিকাদারদের দাবি, কাজের অগ্রগতি ও চুক্তির শর্ত উপেক্ষা করে এভাবে বিপুল অঙ্কের অর্থ পরিশোধের ফলে সরকারি অর্থ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। একজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এ ধরনের বেআইনি আর্থিক লেনদেনের কারণে সরকারের বিপুল আর্থিক ক্ষতি ও রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

তবে ১৫ কোটি টাকার বিল অনুমোদন, দেড় কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগের স্বাধীন যাচাই, নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া জরুরি।

৫০ লাখ টাকার তামার পাইপ চুরি, নাকি সাজানো ঘটনা?

নির্মাণাধীন বরিশাল ক্যান্সার হাসপাতালে ৫০ লাখ টাকা মূল্যের তামার পাইপ চুরির অভিযোগ ঘিরেও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, চুরির ঘটনা দেখিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হলেও পরবর্তী তদন্তে অভিযোগের সঙ্গে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির বড় ধরনের অসংগতি ধরা পড়ে।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৫০ লাখ টাকার মালামাল চুরির দাবি করেছিল। তবে পুলিশি অনুসন্ধানে প্রকৃতপক্ষে খুব সামান্য কিছু পাইপ চুরির তথ্য পাওয়া যায়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা। এ ঘটনায় মূল অপরাধীকে গ্রেপ্তারের পর আদালত তাঁকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হাসপাতালের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, নির্ধারিত মালামাল ক্রয় না করে বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে চুরির ঘটনাটি সাজানো হয়ে থাকতে পারে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে ক্রয়সংক্রান্ত নথি, মালামালের মজুত, চুরির জিডি এবং তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা প্রয়োজন।

বদলির আদেশেও অনড়, সরকারি বাসভবনে বসেই দাপ্তরিক কাজ!

প্রশাসনিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ১৬ জন নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে ফয়সাল আলমকেও ঢাকায় বদলি করা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সেই আদেশ কার্যকর না করে বরিশালে অবস্থান করছেন। কার্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত না হয়ে সরকারি বাসভবনে বসেই দাপ্তরিক নথিপত্রে স্বাক্ষর করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

সরকারি বদলির আদেশ কার্যকর না হওয়ার কারণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর কর্মস্থলে উপস্থিতির নথি যাচাই করা হলে প্রশাসনিক অনিয়মের বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে। বদলির আদেশ বাস্তবায়নে বিলম্বের পেছনে কোনো প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা দরকার।

সরকারি জ্বালানি, ব্যক্তিগত যাতায়াত ও ঐতিহাসিক বাংলোয় পুকুর খনন

ফয়সাল আলমের বিরুদ্ধে সরকারি জ্বালানি ব্যবহার করে ব্যক্তিগত কাজে খুলনায় যাতায়াতের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি বরিশাল গণপূর্তের শতবর্ষী ঐতিহাসিক বাংলোর আঙিনায় রাতের আঁধারে পুকুর খনন করে সরকারি সম্পদ ও স্থাপনার অপব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

ঐতিহাসিক বাংলোর আঙিনায় পুকুর খননের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু সরকারি সম্পদের ব্যবহারসংক্রান্ত প্রশ্ন নয়, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার সংরক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট স্থাপনার নথি, অনুমোদন, কাজের পরিমাণ এবং সরকারি ব্যয়ের হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।

আমুর আশীর্বাদ থেকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা—ফয়সালের ‘নতুন রূপ’?

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, একসময় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আমির হোসেন আমুর আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে বরিশাল গণপূর্তে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন ফয়সাল আলম। সরকার পরিবর্তনের পর তিনি রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করে নতুন রূপে আবির্ভূত হয়েছেন এবং আবারও অনিয়মে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ছাড়া গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর বরিশাল সফরের পর তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মের মাত্রা বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রধান প্রকৌশলীকে উপহার দেওয়ার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। তবে উপহার দেওয়ার অভিযোগ, এর প্রকৃতি এবং কোনো অনিয়মের সঙ্গে এর যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দুই বছর পরপর পদায়নের প্রচলিত বিধান থাকা সত্ত্বেও ফয়সাল আলমের বদলি না হওয়ায় তাঁর প্রভাব ও অনিয়মের সুযোগ ক্রমেই বাড়ছে। তবে তাঁর পদায়নসংক্রান্ত বিধান, বদলির নথি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যাচাই না করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তদন্তের আশ্বাস

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেদ হুসাইনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানানো হয়েছে, উদ্ভূত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হলে দ্রুত কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সূত্রটি জানিয়েছে।

একাধিক গুরুতর অভিযোগের পরও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, ১৫ কোটি টাকার বিল অনুমোদনের নথি কী বলছে, ক্যান্সার হাসপাতালের মালামাল ক্রয় ও চুরির তদন্তে কী তথ্য পাওয়া গেছে এবং বদলির আদেশ কেন কার্যকর হয়নি—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সরকারি অর্থের হিসাব নিরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য প্রকাশ করা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থ ও সম্পদের ক্ষতি হয়েছে কি না, তা নিরূপণ করাও প্রয়োজন।

ফয়সাল আলম এর বিগত সরকারের আমলে দুর্নীতির খতিয়ানসহ বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে…..

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।