বুধবার, ২১শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

নীরব উত্তর: অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর গল্প

রওশন জাহান মিতু
অক্টোবর ২১, ২০২৬ ২:৪১ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সব ক্ষত দেখা যায় না, সব ত্যাগের স্বীকৃতি মেলে না—তবু কিছু মানুষ নীরবে বিলিয়ে যান নিজের সবটুকু

জীবনের সব ক্ষত শরীরে দাগ হয়ে ফুটে ওঠে না। কিছু ক্ষত লুকিয়ে থাকে মনের গভীরে, হাসির আড়ালে, নীরব দীর্ঘশ্বাসে কিংবা রাতের নিঃসঙ্গতায়। আবার সব ত্যাগের ভাগেও জোটে না প্রাপ্তি, স্বীকৃতি কিংবা কৃতজ্ঞতার সামান্য শব্দ। তবু পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা নিজের কষ্ট আড়াল করে অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিরন্তর চেষ্টা করে যান। নিজের স্বপ্ন, ইচ্ছা, আনন্দ এমনকি প্রয়োজনটুকুও বিসর্জন দেন প্রিয়জনদের ভালো রাখার আশায়। তাঁদের জীবনের অনেক গল্প অজানাই থেকে যায়, তাঁদের ত্যাগের হিসাব কেউ রাখে না। অথচ অন্যের সুখের পেছনে নিঃশব্দে জড়িয়ে থাকে তাঁদেরই অসংখ্য না-বলা কথা।

শান্তা কামালীর লেখা কয়েকটি পঙ্‌ক্তিতে উঠে এসেছে জীবনের এমনই এক গভীর বাস্তবতা—

“নীরব উত্তর,

সব ক্ষত দেখায় না দাগ,

সব ত্যাগ পায় না ভাগ

কিছু মানুষ নিঃশেষ হয়,

অন্যের মুখে হাসি জোগায়।

— শান্তা কামালী”

নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে কত গল্প

‘সব ক্ষত দেখায় না দাগ’—এই কথাটির মধ্যে রয়েছে মানুষের মনোজগতের এক গভীর সত্য। শারীরিক ক্ষত চোখে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে তা শুকিয়েও যায়। কিন্তু মনের ক্ষত সব সময় দৃশ্যমান হয় না। প্রিয় মানুষের অবহেলা, সম্পর্কের ভাঙন, অপূর্ণ স্বপ্ন, দায়িত্বের চাপ কিংবা বারবার নিজেকে বিসর্জন দেওয়ার যন্ত্রণা—এসবের কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন থাকে না। মানুষ বাইরে থেকে স্বাভাবিক থাকে, হাসে, কথা বলে, কাজ করে; অথচ ভেতরে ভেতরে হয়তো প্রতিনিয়ত লড়াই করে চলে।

আমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁদের মুখের হাসি দেখে তাঁদের কষ্টের গভীরতা বোঝার উপায় নেই। তাঁরা নিজের দুঃখের কথা সহজে কাউকে বলেন না। অন্যকে বিব্রত করতে চান না, প্রিয়জনদের চিন্তায় ফেলতে চান না, কিংবা নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করতে চান না। ফলে তাঁদের নীরবতাকেই অনেকে শক্তি মনে করেন। অথচ সেই নীরবতার আড়ালেও থাকতে পারে অভিমান, একাকিত্ব ও অসংখ্য অপূর্ণতার গল্প।

সব ত্যাগের স্বীকৃতি মেলে না

‘সব ত্যাগ পায় না ভাগ’—পঙ্‌ক্তিটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের প্রতিটি ত্যাগের বিনিময়ে সমান প্রাপ্তি আসে না। কেউ পরিবারের জন্য নিজের স্বপ্নকে পিছিয়ে দেন, কেউ সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে নিজের বর্তমানের আনন্দ বিসর্জন দেন, কেউ প্রিয় মানুষের সুখের জন্য নিজের চাওয়াগুলোকে ছোট করে দেখেন। আবার কেউ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে বারবার নিজের অভিমান গিলে ফেলেন।

কিন্তু তাঁদের এই ত্যাগের মূল্য সব সময় বোঝা হয় না। অনেক সময় তাঁদের আত্মত্যাগকে দায়িত্ব বলে ধরে নেওয়া হয়, তাঁদের ভালোবাসাকে স্বাভাবিক প্রাপ্য মনে করা হয়। তাঁরা যে ক্লান্ত হন, তাঁদেরও যে একটু যত্ন, ভালোবাসা ও আশ্বাসের প্রয়োজন হয়—সেই কথাটি অন্যদের মনে থাকে না।

এখানেই জীবনের এক নির্মম বৈপরীত্য। যাঁরা অন্যের ভালো থাকার জন্য সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করেন, অনেক সময় তাঁরাই নিজের ভালো থাকার অধিকার থেকে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হন।

অন্যের হাসির পেছনে নিজের কান্না

‘কিছু মানুষ নিঃশেষ হয়, অন্যের মুখে হাসি জোগায়’—এই শেষ দুই পঙ্‌ক্তিতে কবিতার মূল অনুভূতি যেন পূর্ণতা পেয়েছে। এখানে ‘নিঃশেষ হওয়া’ শুধু শারীরিক ক্লান্তি কিংবা অর্থনৈতিক ত্যাগের কথা নয়, এটি নিজের অনুভূতি, ইচ্ছা, স্বপ্ন ও মানসিক শক্তিকে ক্রমাগত অন্যের জন্য ব্যয় করে যাওয়ারও প্রতীক।

একজন মা সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের অসংখ্য ইচ্ছাকে বিসর্জন দেন। একজন বাবা পরিবারের নিশ্চয়তা দিতে নিজের ক্লান্তি আড়াল করেন। কোনো বন্ধু অন্য বন্ধুর বিপদের সময় পাশে দাঁড়িয়ে নিজের কষ্টের কথা ভুলে থাকেন। কোনো মানুষ সম্পর্কের শান্তি বজায় রাখতে নিজের অভিমান প্রকাশ না করে নীরবে সব মেনে নেন। তাঁদের প্রত্যেকের গল্প এক নয়, কিন্তু অন্যকে ভালো রাখার আকাঙ্ক্ষায় নিজের কষ্ট আড়াল করার প্রবণতায় রয়েছে এক ধরনের মিল।

তবে অন্যকে ভালো রাখা আর নিজেকে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলা এক বিষয় নয়। ভালোবাসা কখনো আত্মবিসর্জনের একতরফা প্রতিযোগিতা হতে পারে না। যে মানুষটি সবার মুখে হাসি ফোটান, তাঁর মুখেও হাসি ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব অন্যদের রয়েছে। তাঁরও বিশ্রাম দরকার, তাঁরও কথা শোনার মানুষ দরকার, তাঁরও প্রাপ্য সম্মান ও ভালোবাসা দরকার।

নীরবতাকে দুর্বলতা ভাবার ভুল

সমাজে আমরা প্রায়ই উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ, দৃশ্যমান সাফল্য কিংবা প্রকাশ্য অবদানের মূল্যায়ন করি। কিন্তু নীরবে দায়িত্ব পালন করা মানুষগুলোর অবদান অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। যাঁরা নিজের কষ্ট প্রকাশ করেন না, তাঁদের কষ্ট নেই—এমন ধারণা ভুল। যাঁরা প্রতিদানের আশা করেন না, তাঁদেরও যে স্বীকৃতির প্রয়োজন হতে পারে, সেটিও ভুলে যাওয়া উচিত নয়।

কেউ নীরব থাকলেই ধরে নেওয়া যায় না যে তিনি ভালো আছেন। কেউ সব সময় অন্যের পাশে দাঁড়ালেই ধরে নেওয়া যায় না যে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। বরং কখনো কখনো একটি আন্তরিক প্রশ্ন—তুমি কেমন আছ?—একটি মনোযোগ দিয়ে শোনা কথা কিংবা নিঃস্বার্থ সহযোগিতা একজন মানুষের ভেতরের জমে থাকা ভার অনেকটাই হালকা করতে পারে।

উপলব্ধির নামই মানবিকতা-

শান্তা কামালীর ‘নীরব উত্তর’ কেবল কয়েকটি পঙ্‌ক্তির কবিতা নয়; এটি মানুষের সম্পর্ক, আত্মত্যাগ ও অব্যক্ত বেদনার দিকে তাকানোর একটি উপলক্ষ। এর প্রতিটি পঙ্‌ক্তি আমাদের ভাবতে শেখায়—আমরা কি সত্যিই আমাদের কাছের মানুষগুলোর কষ্ট বুঝতে চেষ্টা করি? তাঁদের ত্যাগকে কি যথাযথ সম্মান দিই? নাকি তাঁদের নিরন্তর অবদানকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ মনে করি?

জীবনে সব ক্ষতের জন্য ওষুধ থাকে না, সব ত্যাগের প্রতিদানও দেওয়া সম্ভব হয় না। কিন্তু ভালোবাসা, সহমর্মিতা, কৃতজ্ঞতা ও যত্ন দিয়ে অনেক অদৃশ্য ক্ষতের ভার কমানো যায়। যে মানুষটি নীরবে আমাদের জন্য অনেক কিছু করেন, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। কখনো একটি ধন্যবাদ, কখনো একটু সময়, কখনো পাশে থাকার আশ্বাসই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে মূল্যবান প্রাপ্তি।

উল্লেখ্য, পৃথিবীর সব ভালোবাসা শব্দে প্রকাশ পায় না, সব কষ্ট চোখের জলে ধরা পড়ে না, আর সব ত্যাগের হিসাবও রাখা হয় না। তবু মানুষের জীবনে নীরবে ভালোবেসে যাওয়া মানুষগুলোর অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। তাঁদের ত্যাগকে কেবল মহৎ বলে প্রশংসা করাই যথেষ্ট নয়; তাঁদের কষ্ট বোঝা, তাঁদের প্রয়োজনের খোঁজ নেওয়া এবং তাঁদেরও ভালো থাকার সুযোগ করে দেওয়া জরুরি।

কারণ, অন্যের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে যাঁরা নিজের হাসি আড়াল করে ফেলেন, তাঁদের জীবনেও আনন্দ ফিরে আসা উচিত। নীরব মানুষগুলোর প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো—তাঁদের নীরবতার ভাষা বোঝার চেষ্টা করা।

সব ক্ষত দেখা যায় না, সব ত্যাগের স্বীকৃতি মেলে না; কিন্তু প্রতিটি মানুষেরই প্রাপ্য এমন একটি পৃথিবী, যেখানে অন্যকে ভালো রাখতে গিয়ে তাঁকে নিজেকে নিঃশেষ করে দিতে হয় না।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।