ফাইল ছবি
পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ, দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ, অডিট আপত্তি এবং সর্বশেষ নারীসংক্রান্ত অভিযোগ—সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে বাংলাদেশ রেলওয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা আফজাল হোসেন। কিন্তু এত অভিযোগের পরও কীভাবে একের পর এক সরকারের আমল পেরিয়ে তিনি রেলওয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে পৌঁছে গেলেন—এ প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা আফজাল হোসেন রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক যোগাযোগ ও প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠতার সুবিধা পেয়েছেন। এমনকি ক্ষমতার পালাবদলের পরও তার প্রভাব কমেনি। বরং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রেলওয়ের শীর্ষ দায়িত্বে উঠে আসার পর এখন নতুন সরকারের আমলেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন।
প্রশ্ন উঠছে—এত অভিযোগ ও বিতর্কের পরও কোন যোগ্যতা, দক্ষতা ও প্রশাসনিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে আফজাল হোসেনকে রেলওয়ের সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব দেওয়ার উপযুক্ত মনে করা হলো?
দুদকে অভিযোগের পরও পদোন্নতি ও দায়িত্ব
পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দায়েরের বিষয়টি সামনে আসার পরও আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বরং অন্তর্বর্তী সরকারের এক নোটিশে জানানো হয়, বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আফজাল হোসেন আগামী ৮ ডিসেম্বর থেকে রেলপ্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন।
এ নিয়ে রেলওয়ের ভেতরে-বাইরে প্রশ্ন উঠেছে—যে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বড় প্রকল্পে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত বা অভিযোগ নিষ্পত্তির আগেই তাকে এত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার যৌক্তিকতা কী?
৪০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে সিঙ্গেল লাইন কেন?
পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্প ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো এর অবকাঠামোগত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পদ্মা সেতুতে রেল চলাচলের জন্য সিঙ্গেল লাইন রাখা হয়। একই সঙ্গে ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত রেল সংযোগও সিঙ্গেল লাইনে নির্মাণ করা হয়েছে।
সমালোচকদের প্রশ্ন—এত বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত একটি জাতীয় মেগা প্রকল্পের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা বিবেচনায় ডাবল লাইনের পরিবর্তে সিঙ্গেল লাইন কেন বেছে নেওয়া হলো?
তাদের আরও দাবি, চীনা ঋণে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের ব্যয়, ঋণের শর্ত, নকশা প্রণয়ন, সম্ভাব্যতা যাচাই এবং প্রকল্প অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়ায় পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
প্রতিদিন ২৪ জোড়া ট্রেনের পরিকল্পনা, বাস্তবে মাত্র ৫ জোড়া
প্রকল্প গ্রহণের সময় প্রতিদিন ২৪ জোড়া যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন চলাচলের পরিকল্পনা ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। কিন্তু বাস্তবে এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচ জোড়া যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনা সম্ভব হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফলে প্রকল্পে ফলে প্রকল্পের বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত আয় ও ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
রেলওয়ের লোকসান, টিকিটের মূল্য বৃদ্ধি এবং কাঙ্ক্ষিত সেবার মান নিয়ে যখন যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে, তখন এত বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পের আর্থিক কার্যকারিতা নিয়েও স্বাধীন মূল্যায়নের দাবি উঠেছে।
ভুয়া বিল-ভাউচার ও পছন্দের ঠিকাদারের অভিযোগ
রেলওয়ের একাধিক সূত্রের দাবি, আফজাল হোসেন পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন কাজে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আসাদুল হক, আবু জাফর, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আরিফুর রহমানসহ কয়েকজন কর্মকর্তা এবং পছন্দের ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি ও অর্থ উত্তোলনের ঘটনা ঘটেছে।
ব্লাস্ট সাপ্লাই, রাস্তা মেরামতসহ বিভিন্ন কাজে পছন্দের ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়া, নামসর্বস্ব পত্রিকায় টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, কম প্রতিযোগিতার মধ্যে টিইসি গঠন এবং কাজ সম্পন্ন না করেই বিল উত্তোলনের মতো অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের প্রতিটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও নেওয়া জরুরি।
অডিট আপত্তি ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ
প্রকল্পের দুর্নীতি ও অডিট আপত্তি ধামাচাপা দিতে একটি অঘোষিত টিম কাজ করেছে বলেও রেলওয়ের ভেতরের কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে।
অভিযোগে কয়েকজন কর্মকর্তার নামও উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে যুগ্মসচিব (অডিট ও আইসিটি) মীর আলমগীর হোসেন, উপসচিব হোসনে আরা, উপপরিচালক শামীমা নাসরিন (বিথি), উপপরিচালক ফারহানা সুলতানা এবং প্রধান পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমানের নাম রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের চুক্তিপত্র, অডিট রিপোর্ট ও আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তাদের ভূমিকা ছিল।
তবে এ অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই না করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
বদলি-পদায়ন বাণিজ্যের অভিযোগও
শুধু প্রকল্পের অর্থনৈতিক অনিয়ম নয়, রেলওয়ের বিভিন্ন পদে বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করেও আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদে অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
ফলে প্রশ্ন উঠছে—প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার নামে একই কর্মকর্তাকে বারবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তার কর্মদক্ষতা, পূর্ববর্তী প্রকল্পের ফলাফল এবং তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে?
নারীসংক্রান্ত অভিযোগে নতুন বিতর্ক
দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যেই আফজাল হোসেনকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি নারীসংক্রান্ত অভিযোগ।
সূত্রের দাবি, সোহেলী আক্তার নামের এক নারীর সঙ্গে আফজাল হোসেনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি মীমাংসার দাবিতে ওই নারী আফজাল হোসেনকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন বলেও জানা গেছে।
তবে এই অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা, আইনি নোটিশের বিষয়বস্তু এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য যাচাই করা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
তিন সরকারের আমল পার করে কীভাবে বহাল?
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই।
শেখ হাসিনা সরকারের আমলে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তা কীভাবে পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রেলওয়ের শীর্ষ দায়িত্বে এলেন এবং এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকলেন—তা নিয়ে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও নানা আলোচনা রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ক্ষমতার পালাবদল হলেও প্রশাসনিক নেটওয়ার্ক ও প্রভাবশালী যোগাযোগের কারণে আফজাল হোসেনের অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি।
এ কারণেই প্রশ্ন উঠেছে—ব্যক্তি নয়, পদ ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে কি তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হয়েছে?
এখন সামনে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি
পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয়, চীনা ঋণের শর্ত, প্রকল্পের নকশা ও সক্ষমতা, টেন্ডার প্রক্রিয়া, ঠিকাদার নির্বাচন, বিল-ভাউচার, অডিট আপত্তি এবং সম্ভাব্য অর্থ আত্মসাত—সবকিছু নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগ অসত্য হলে নথি ও তদন্তের মাধ্যমে সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
কারণ প্রশ্নটি শুধু আফজাল হোসেনকে ঘিরে নয়—প্রশ্নটি হাজার হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, রেলওয়ের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা এবং সরকারি প্রকল্পে জবাবদিহির।
এখন দেখার বিষয়, দুদকে উত্থাপিত অভিযোগ, অডিট আপত্তি এবং প্রকল্পের আর্থিক ও প্রশাসনিক নথি কতটা গভীরভাবে পরীক্ষা করা হয়। আর সেই তদন্তেই হয়তো বেরিয়ে আসবে—পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের আড়ালে আসলে কী ঘটেছিল এবং কীভাবে বিতর্কিত অভিযোগের মধ্যেও আফজাল হোসেন একের পর এক সরকারের আমলে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
এসব অনিয়মের অভিযোগ ছাড়াও, দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযোগ, ও আদ্যোপান্ত নিয়ে বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে………..
