বৃহস্পতিবার, ১৫ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৩০শে আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

পাখি আমদানির আড়ালে শত শত কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ, তদন্তের মুখে বন কর্মকর্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবর ১৫, ২০২৬ ৬:৩৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বদলি-পদায়নে ঘুষের নির্ধারিত দর, দেড় হাজার কোটি টাকার সুফল প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ; দেড় বছরেও শেষ হয়নি পুরোনো অনুসন্ধান। ফাইল ছবি

পাখি আমদানির আড়ালে শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে বন অধিদপ্তর। অভিযোগের সূত্র ধরে অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্ভাব্য যোগসাজশ, আমদানি কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই সঙ্গে বন অধিদপ্তরে বদলি ও পদায়নে ঘুষ লেনদেন এবং বড় অঙ্কের সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের পুরোনো অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

তবে এসব অভিযোগের পাশাপাশি সামনে এসেছে অনুসন্ধানের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বন অধিদপ্তরে অভিযান চালিয়ে নথিপত্র সংগ্রহ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল দুদক। এরপর দেড় বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বদলি-পদায়নে ঘুষ এবং প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধান নিষ্পত্তির বিষয়ে স্পষ্ট অগ্রগতির তথ্য পাওয়া যায়নি।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম জানান, পাখি আমদানির আড়ালে অর্থ পাচারের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা ও অন্যান্য বিষয় অনুসন্ধান করা হবে। নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর অনুসন্ধান পর্যায়ে আটকে থাকা বিষয়গুলোও পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

বদলি-পদায়নে ঘুষের নির্ধারিত দর, অভিযোগের কেন্দ্রে বন অধিদপ্তর

দুদকের এনফোর্সমেন্ট ইউনিটের ২০২৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারির নথি অনুযায়ী, পরদিন বন ভবনে অভিযান চালানো হয়। এ সময় বন অধিদপ্তরের তৎকালীন প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসাইন চৌধুরী, উপপ্রধান বন সংরক্ষক ও টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল) প্রকল্পের পরিচালক গোবিন্দ রায়, উম্মে হাবিবাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন নথিপত্রও সংগ্রহ করে দুদক।

অভিযানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনে বন বিভাগের বিভিন্ন রেঞ্জ, চেকপোস্ট ও বিভাগীয় কার্যালয়ে পদায়নের ক্ষেত্রে পদভেদে ঘুষের নির্ধারিত অঙ্ক থাকার অভিযোগ উঠে আসে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দুই বছরের জন্য প্রথম শ্রেণির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা পদে পদায়নে ৫০ লাখ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৩০ লাখ টাকা এবং তৃতীয় শ্রেণিতে ২০ লাখ টাকা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

একই প্রতিবেদনে দুই বছরের জন্য প্রথম শ্রেণির রেঞ্জ কর্মকর্তা পদে ১৫ লাখ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১০ লাখ টাকা এবং তৃতীয় শ্রেণিতে ৫ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে, এক বছরের জন্য প্রথম শ্রেণির চেকপোস্টে স্টেশন কর্মকর্তা পদে ২০ লাখ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১০ লাখ টাকা এবং তৃতীয় শ্রেণিতে ৫ লাখ টাকা লেনদেনের তথ্য উঠে আসে।

অভিযোগ অনুযায়ী, পদায়নের সময় অর্থ লেনদেনের পাশাপাশি নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন পদায়ন না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে মাসিক মাসোহারাও নেওয়া হতো।

এসব অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে বন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদায়নের স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং সরকারি দায়িত্ব পালনের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠবে। তবে প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন অনুসন্ধান ও তদন্তের ফলাফল।

দেড় হাজার কোটি টাকার সুফল প্রকল্পেও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

বন অধিদপ্তরের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার টেকসই বন ও জীবিকা (সুফল) প্রকল্পেও অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নেওয়া এ প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা রেঞ্জে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫১০ হেক্টর এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৬২ হেক্টর এলাকায় বনায়ন ও নার্সারি সৃজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

দুদকের এনফোর্সমেন্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫১০ হেক্টর এলাকায় বাগান সৃজনের বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে আনুমানিক ১৬০ হেক্টর এলাকায় চারা রোপণের তথ্য পাওয়া যায়। বাকি এলাকায় বনায়ন না করেই বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তী অর্থবছরে ৩৬২ হেক্টর এলাকায় বনায়নের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের তথ্য উঠে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কোথাও বাগানের সাইনবোর্ড থাকলেও ভেতরে গাছের অস্তিত্ব না থাকার কথা বলা হয়েছে। আবার যেসব স্থানে চারা রোপণ করা হয়েছিল, সেগুলোর যথাযথ পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ অবস্থায় প্রকল্পের বরাদ্দ অনুযায়ী বাস্তবে কতটুকু বনায়ন হয়েছে, অর্থ কোন খাতে কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ের কাজের সঙ্গে দাপ্তরিক নথিপত্রের সামঞ্জস্য কতটা—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা জরুরি হয়ে উঠেছে।

কারণ, বনায়ন প্রকল্পে অনিয়ম প্রমাণিত হলে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বন পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার লক্ষ্যও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সুপারিশের পরও শেষ হয়নি অনুসন্ধান, প্রশ্ন দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে

সুফল প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগের ভিত্তিতে প্রকল্প পরিচালক গোবিন্দ রায় ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সুপারিশ করে এনফোর্সমেন্ট প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল দুদক। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এসব অভিযোগের অনুসন্ধান শেষ হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে পাখি আমদানির আড়ালে শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগে নতুন অনুসন্ধানের উদ্যোগ বন অধিদপ্তরের আর্থিক লেনদেন, আমদানি কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে নজরদারির বিষয়টি সামনে এনেছে।

প্রশ্ন উঠেছে, আগের অভিযান, নথিপত্র সংগ্রহ ও অনুসন্ধানের সুপারিশের পরও পুরোনো অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি কেন দীর্ঘায়িত হচ্ছে? একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর সেগুলোর অনুসন্ধান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম জানান, নতুন কমিশন দায়িত্ব নিয়েছে অল্প কিছুদিন আগে। এ কারণে প্রতিটি বিষয় কমিশনের নজরে রাখা হচ্ছে এবং অনুসন্ধান পর্যায়ে আটকে থাকা বিষয়গুলোও পর্যালোচনা করা হবে।

সব মিলিয়ে বন অধিদপ্তরকে ঘিরে এখন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ সামনে রয়েছে—পাখি আমদানির আড়ালে অর্থ পাচার, বদলি-পদায়নে ঘুষ লেনদেন এবং সুফল প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারে অনিয়ম। অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র উদ্‌ঘাটনে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই, আর্থিক লেনদেনের অনুসন্ধান এবং মাঠপর্যায়ের কাজের বাস্তব অবস্থা পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।

এখন দেখার বিষয়, দুদকের নতুন অনুসন্ধান ও পুরোনো অভিযোগগুলোর পর্যালোচনা কতদূর এগোয় এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত আসে। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা কর্মকর্তাদের দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।