মঙ্গলবার, ১০ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৫শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

প্রকল্পে ২০% কমিশনের অভিযোগ: গণপূর্তে ‘কমিশন সাম্রাজ্য’ গড়ে তুলেছেন প্রকৌশলী জোবায়ের,

নিজস্ব প্রতিবেদক
মার্চ ৯, ২০২৬ ১১:৫০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ফাইল: ছবি
টেন্ডার পেতে কমিশন, বিল ছাড়ে ঘুষ, কাজ না করেই কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগ—ক্ষমতার ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন ধরেই অদৃশ্য কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরে প্রকৌশলী যোবায়ের বিন হায়দার।

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে কমিশন বাণিজ্য, বিল আটকে ঘুষ আদায়, কাজ শেষ হওয়ার আগেই পুরো বিল উত্তোলন—এমন একাধিক বিস্ফোরক অভিযোগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জোবায়ের বিন হায়দার।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ঠিকাদারদের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজ পেতে কিংবা বিল ছাড় করাতে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া যেন তার দপ্তরে অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের একটি প্রভাবশালী পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং প্রশাসনিক বলয়ের শক্ত অবস্থান—এই তিন শক্তির সমন্বয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই নিজের প্রভাব বিস্তার করে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ থাকলেও সেগুলো অনেক সময়ই তদন্তের মুখ দেখেনি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

এদিকে ক্ষমতার ছায়ায় ‘অদৃশ্য ঢাল’ স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জে কথিত “আজমেরী বাহিনী’র প্রধান হিসেবে পরিচিত পিজা শামীমের ছেলে হওয়ায় জোবায়ের বিন হায়দার দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বলয়ের বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছেন। এই পারিবারিক প্রভাবই তাকে দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে সহায়তা করেছে বলে মনে করেন অনেকেই।
ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি গণপূর্তের বিভিন্ন প্রকল্পকে ঘিরে একটি শক্তিশালী প্রভাব বলয় গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

আবার টেন্ডার পেতে ‘কমিশন ট্যাক্স’ গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, কোনো প্রকল্পের কাজ পেতে হলে আগে থেকেই নির্দিষ্ট হারে কমিশন দিতে হতো। অভিযোগ অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন না দিলে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতা তৈরি করা হতো।

একাধিক ঠিকাদার জানান, কমিশন না দিলে তাদের বিল দীর্ঘদিন আটকে রাখা হতো অথবা বিভিন্ন অজুহাতে কাজের অনুমোদন বিলম্বিত করা হতো। ফলে বাধ্য হয়েই অনেক ঠিকাদার এই কমিশন দিতে সম্মত হতেন।
কাজ শেষের আগেই বিল উত্তোলনের অভিযোগ
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো—কিছু প্রকল্পে কাজ সম্পূর্ণ না করেই পুরো বিল উত্তোলনের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

দপ্তরের ভেতরে-বাইরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে এসব অনিয়ম পরিচালনা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট চক্র গণপূর্তের কিছু প্রকল্পে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে।

পদায়ন বাণিজ্যের অভিযোগও
শুধু প্রকল্প কমিশন নয়, পদায়ন বাণিজ্যের মাধ্যমেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। দপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ বা বদলির ক্ষেত্রে প্রভাব খাটিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি, তবুও প্রশাসনিক মহলে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে।

রাজনৈতিক যোগাযোগের জোর- জোবায়ের বিন হায়দারের রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়েও প্রশাসনিক মহলে নানা আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর নরসিংদীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি সফরের প্রস্তুতি ও সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়।

ওই সফর সফলভাবে সম্পন্ন করতে সহযোগিতা করার জন্য ১৮ নভেম্বর ২০২৩ তারিখে নরসিংদীর তৎকালীন জেলা প্রশাসক বদিউল আলম তাকে একটি কৃতজ্ঞতা পত্র প্রদান করেন। এই ঘটনার পর প্রশাসনিক মহলে তার প্রভাব ও যোগাযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

দুর্নীতির অভিযোগে প্রশ্নের মুখে গণপূর্ত- গণপূর্ত অধিদপ্তর দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ অসংখ্য অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এই দপ্তরের ওপর ন্যস্ত। তাই এই দপ্তরের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা নিঃসন্দেহে একটি গুরুতর বিষয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অবকাঠামো খাতে দুর্নীতি হলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে দেশের উন্নয়নের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নিম্নমানের নির্মাণ কাজ বা অনিয়মের কারণে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও তারা সতর্ক করেছেন।

তদন্তের দাবি জোরালো হওয়ায়- স্থানীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তীব্র হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, অভিযোগগুলোর বিষয়ে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী জোবায়ের বিন হায়দারের সরাসরি কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন দাবি করেছেন, তাকে উদ্দেশ্য করে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালানো হতে পারে।

প্রশ্ন এখন তদন্তের- সব মিলিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জোবায়ের বিন হায়দারকে ঘিরে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ এখন প্রশাসনিক ও জনমহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তা শুধু একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নয়—বরং সরকারি প্রকল্প ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নকেও সামনে এনে দিয়েছে।
এখন দেখার বিষয়—এই বিস্ফোরক অভিযোগের সত্যতা উদঘাটনে তদন্ত কতদূর এগোয় এবং শেষ পর্যন্ত কারা দায় এড়াতে পারে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।