শুক্রবার, ২৬শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খায়রুজ্জামান কি অফিসবিমুখ? অনিয়মিত উপস্থিতিতে আটকে যাচ্ছে ফাইল, বিলম্বিত হচ্ছে উন্নয়ন কার্যক্রম তদন্তের দাবি সংশ্লিষ্টদের

নিজস্ব প্রতিবেদক
জুন ২৫, ২০২৬ ১১:২৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

তালাবদ্ধ দপ্তর, অচল ফাইল—ফরিদপুর গণপূর্তে কী ঘটছে? ফাইল ছবি

ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খায়রুজ্জামানের বিরুদ্ধে নিয়মিত অফিসে উপস্থিত না থাকা, দাপ্তরিক কার্যক্রমে বিলম্ব সৃষ্টি এবং উন্নয়নমূলক কাজের তদারকিতে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কয়েকজন ঠিকাদার, সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং কার্যালয়ের কিছু কর্মচারীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধান কর্মকর্তার অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি গণপূর্ত বিভাগের কার্যালয়ে গিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর উপস্থিতি যাচাই করতে গিয়ে তাঁর দপ্তর তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখা যায়। সোমবার (২২ জুন) সকাল ১০টা ৫৩ মিনিটে কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে দেখা যায়, নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষ বন্ধ রয়েছে। কক্ষের সামনে দায়িত্বরত এক কর্মচারী জানান, ওই সময় পর্যন্ত নির্বাহী প্রকৌশলী অফিসে আসেননি।

কার্যালয়ের অন্যান্য কক্ষ ঘুরে দেখা গেলে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কর্মস্থলে পাওয়া গেলেও নির্বাহী প্রকৌশলীর অবস্থান সম্পর্কে তারা নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি। কেউ কেউ জানান, তিনি অফিসে আসবেন কি না অথবা কখন আসবেন, সে বিষয়ে তারা অবগত নন।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খায়রুজ্জামানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন কল রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

অফিসে অনুপস্থিতি নাকি প্রশাসনিক দুর্বলতা?

স্থানীয় কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে, ফরিদপুরে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি নিয়মিত অফিস করেন না। অভিযোগ রয়েছে, তিনি অনেক সময় নির্ধারিত অফিস সময়ের পরে কার্যালয়ে আসেন অথবা কোনো কোনো দিন অফিসে উপস্থিত থাকেন না। তবে এসব অভিযোগের স্বপক্ষে আনুষ্ঠানিক কোনো নথি প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেন, নির্বাহী প্রকৌশলীর অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে তাদের বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তারা জানান, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ফাইল অনুমোদন, কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা, মাপজোক সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই এবং বিল পাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর অনুমোদন প্রয়োজন হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নিয়মিত উপস্থিত না থাকায় এসব কার্যক্রমে বিলম্ব হচ্ছে বলে তাদের দাবি।

একজন ঠিকাদার বলেন, আমরা কাজ সম্পন্ন করার পরও অনেক সময় প্রয়োজনীয় নথিতে স্বাক্ষর বা অনুমোদনের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়। অফিসে এসে যদি প্রধান কর্মকর্তাকে পাওয়া না যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই কাজের গতি কমে যায়। এতে শুধু ঠিকাদার নয়, সরকারের প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আরেকজন ঠিকাদার দাবি করেন, অনেক ক্ষেত্রে জরুরি ফাইল নিষ্পত্তি না হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা প্রভাবিত হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, সরকারি কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হলে প্রশাসনিক অনুমোদন দ্রুত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া ধীরগতির হয়ে পড়লে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হয়।

বিল পেতে দেরি, বাড়ছে ঠিকাদারদের আর্থিক চাপ

কয়েকজন ঠিকাদার আরও অভিযোগ করেন, কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর বিল পেতে দেরি হওয়ায় তাদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। তারা জানান, নির্মাণসামগ্রী, শ্রমিকের মজুরি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটাতে তাদের নিয়মিত অর্থের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বিল অনুমোদনে বিলম্ব হলে পুরো আর্থিক ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হয়।

অভিযোগকারীরা বলেন, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সময়মতো বিল পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিল আটকে গেলে বা বিলম্বিত হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে লিখিত কোনো তথ্য বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।

অধস্তনদের নীরবতা, বাড়ছে প্রশ্ন

গণপূর্ত বিভাগের কয়েকজন অধস্তন কর্মচারীর সঙ্গে কথা বললে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অফিসে উপস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

একজন কর্মচারী বলেন, তিনি আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি কখন অফিসে আসবেন বা যাবেন, সে বিষয়ে মন্তব্য করার এখতিয়ার আমাদের নেই।

আরেকজন কর্মচারী বলেন, প্রধান কর্মকর্তার উপস্থিতি সম্পর্কে কোনো বক্তব্য দিলে তা ভুলভাবে ব্যাখ্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই আমরা এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতে চাই না।

উন্নয়ন প্রকল্পে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা

সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি জেলার গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জেলার বিভিন্ন সরকারি ভবন নির্মাণ, সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণ এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই পদধারী কর্মকর্তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়মিত উপস্থিত না থাকলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, গণপূর্ত বিভাগের কার্যক্রম সরাসরি বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত। হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস ভবন, আবাসন প্রকল্প এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজে এ বিভাগের দায়িত্ব রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলীর অনুপস্থিতির কারণে অনেক সময় মাঠপর্যায়ের কাজের যথাযথ তদারকি ব্যাহত হয়। এর ফলে কাজের অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং বিভিন্ন সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব হয় না।

তবে কাজের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা কোনো প্রকল্পে অনিয়ম হয়েছে—এমন নির্দিষ্ট তথ্য অভিযোগকারীরা প্রকাশ করতে পারেননি। তারা কেবল নিয়মিত তদারকির অভাবের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করেছেন।

যোগাযোগে অপ্রাপ্যতা নিয়েও অভিযোগ

এদিকে অভিযোগ উঠেছে যে, নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ করাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। কয়েকজন ঠিকাদার দাবি করেন, বিভিন্ন প্রয়োজনীয় বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও অনেক সময় তাঁকে ফোনে পাওয়া যায় না। তবে এই অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নাগরিক, ঠিকাদার ও সেবাগ্রহীতাদের কার্যকর যোগাযোগ থাকা জরুরি। কোনো কর্মকর্তা দীর্ঘ সময় যোগাযোগের বাইরে থাকলে বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে বিলম্ব সৃষ্টি হতে পারে।

তদন্তের দাবি, ব্যাখ্যার অপেক্ষা

সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, কর্মকর্তাদের নির্ধারিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন এবং কর্মস্থলে উপস্থিত থাকা প্রত্যাশিত। তবে কোনো কর্মকর্তা নির্দিষ্ট দিনে অনুপস্থিত থাকলে তার পেছনে সরকারি দায়িত্ব, দাপ্তরিক সফর, অনুমোদিত ছুটি বা অন্যান্য প্রশাসনিক কারণও থাকতে পারে। নির্বাহী প্রকৌশলীর বক্তব্য পাওয়া না যাওয়ায় তাঁর অনুপস্থিতির কারণ জানা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগকারীরা বলছেন, বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন। তাদের দাবি, যদি অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। অন্যদিকে অভিযোগগুলো অসত্য হলে সেটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার, যাতে বিভ্রান্তির অবসান ঘটে।

এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগ সম্পর্কে তাদের অবস্থান জানা যায়নি।

নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খায়রুজ্জামানের বক্তব্য পাওয়া গেলে বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দিলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
সারাবাংলা সর্বশেষ