বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-কে ঘিরে ওঠা শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। প্রায় এক মাস আগে প্রকাশিত বিস্ফোরক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পরও সংশ্লিষ্টদের নীরবতা জনমনে আরও প্রশ্ন জাগাচ্ছে—এই নীরবতা কি দায় এড়ানোর কৌশল, নাকি আড়াল করা হচ্ছে বড় কোনো অনিয়ম?
নীরবতা নিয়ে প্রশ্নের ঝড়- গত ১৮ মার্চ প্রকাশিত প্রতিবেদনে সাবেক অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার থেকে প্রভাবশালী কর্মকর্তা হয়ে ওঠা নিজাম উদ্দিন পাঠানের বিরুদ্ধে “অঘোষিত চেয়ারম্যান” ও “গডফাদার” হিসেবে সংস্থাকে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ওঠে। তবে এরপর থেকে তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। গণমাধ্যমের একাধিক চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় প্রশ্ন উঠেছে— নীরব থাকা কি দায় স্বীকারের ইঙ্গিত, নাকি কৌশলী আত্মগোপন?
অভিযোগের গভীরতা: কাগজে উন্নয়ন, বাস্তবে শূন্যতা
বিভিন্ন সূত্র বলছে, বিআইডব্লিউটিএ’র অধীনে বাস্তবায়নাধীন বড় বড় প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম হয়েছে। বিশেষ করে— প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বাঘাবাড়ি নদী বন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্পে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
একই কাজের বিপরীতে একাধিক বিল উত্তোলন।
বাস্তবে কাজ না করেই কাগজে সম্পন্ন দেখানো
নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিয়ে মোটা অঙ্কের কমিশন গ্রহণ। এছাড়া প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্পে কাজের অগ্রগতি অর্ধেকেরও কম বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঠিকাদার সিন্ডিকেট ও ‘পার্টনারশিপ’ বাণিজ্য
অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারের সঙ্গে গড়ে উঠেছে ঘনিষ্ঠ সিন্ডিকেট। সরকারি প্রকল্পের অর্থ ঘুরে যাচ্ছে ব্যক্তিগত ব্যবসায়— এমনকি ডেভেলপার ব্যবসায়ও বিনিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। দ:বিধি ৭/১ ধারা সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
একাধিক সূত্র দাবি করছে— যোগ্যতা নয়, সম্পর্কই এখানে মূল শক্তি—এই সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে সংস্থাটিকে গ্রাস করেছে।
সম্পদের বিস্তার নিয়ে বিতর্ক- নিজাম উদ্দিন পাঠানের নামে-বেনামে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও সম্পদের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বনশ্রী-রামপুরা এলাকায় তার বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। এ নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
তদন্ত এগোচ্ছে, কিন্তু ধীরগতির অভিযোগ- অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধান চালাচ্ছে এবং সচিবালয়ে অভিযোগ জমা পড়েছে। তবে তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় জনমনে প্রশ্ন— তদন্ত কি শুধুই আনুষ্ঠানিকতা? নাকি প্রভাবশালীদের কারণে ধীরগতি? এমন প্রশ্নেরই জবাব খুঁজছে সংশ্লিষ্টরা।
কর্তৃপক্ষের রহস্যময় নীরবতা- বিষয়টি নিয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তাদের একমাত্র বক্তব্য—বিষয়টি তদন্তাধীন। এই নীরবতা বরং সন্দেহ আরও বাড়াচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা- বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে— নদীপথ উন্নয়ন থমকে যাবে,
রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় বাড়বে এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রতি জনআস্থা ভেঙে পড়বে। তাদের মতে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন— স্বচ্ছ নিয়োগ ও পদোন্নতি, ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা, উন্মুক্ত অডিট রিপোর্ট, জবাবদিহিমূলক টেন্ডার প্রক্রিয়া।
শেষ প্রশ্ন-দায়মুক্তি নাকি জবাবদিহিতা? বিআইডব্লিউটিএ শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়—এটি দেশের অর্থনীতি ও নদীপথ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। কিন্তু যদি অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে প্রশ্ন একটাই— নিজাম উদ্দিন পাঠানের মতো প্রভাবশালীদের ছায়া থেকে কি আদৌ বের হতে পারবে বিআইডব্লিউটিএ? নাকি নীরবতার আড়ালেই চলবে ‘অঘোষিত শাসন? দেশবাসী এখন তাকিয়ে— তদন্তের ফলাফল ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের দিকে।
