দারিদ্র্য মোকাবিলা ও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে সরকার। দেশের হতদরিদ্র ও নিম্ন আয়ের নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দিতে চালু হচ্ছে বহুল আলোচিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন—এই কর্মসূচিতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বিবেচনা, প্রভাব বা সুপারিশের সুযোগ থাকবে না; শুধুমাত্র প্রকৃত দুস্থরাই পাবেন এই সুবিধা।
জানানো হয়েছে, আগামী মঙ্গলবার (১০ মার্চ) সকাল ১০টায় রাজধানীর বনানীর টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধনের মধ্য দিয়েই শুরু হবে দেশের নতুন সামাজিক নিরাপত্তা উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
প্রথম ধাপে ৩৭ হাজার ৫৬৭ নারীপ্রধান পরিবার
পাইলট প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে দেশের ১৩টি জেলার ১৩টি সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে এই কার্যক্রম চালু হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে মাসিক ভাতা দেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশব্যাপী ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করছেন। উপকারভোগী বাছাইয়ে কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা নয়, প্রকৃত দরিদ্রদের অগ্রাধিকারই নিশ্চিত করা হচ্ছে।
নারীর নামে কার্ড, সরাসরি ভাতা
সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. জাহিদ কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরে বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পরিবারের নারীপ্রধানের নামে দেওয়া হবে আধুনিক ‘ফ্যামিলি কার্ড’।
এই কার্ডে থাকবে স্পর্শবিহীন চিপ, কিউআর কোড এবং এনএফসি প্রযুক্তি, যা এটিকে করবে নিরাপদ, টেকসই ও সহজ ব্যবহারযোগ্য। একটি কার্ডে একটি পরিবারের ৫ জন সদস্য অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। তবে যৌথ পরিবারে সদস্য বেশি হলে আনুপাতিকভাবে একাধিক কার্ড দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
মাসে ২,৫০০ টাকা, ভবিষ্যতে খাদ্য সহায়তাও
এই কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত পরিবারগুলো মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। ভবিষ্যতে একই মূল্যের খাদ্যপণ্য সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
ভাতার অর্থ সরাসরি জি-টু-পি (Government to Person) পদ্ধতিতে উপকারভোগী নারীর মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে, ফলে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না।
প্রযুক্তিনির্ভর যাচাই, নেই দুর্নীতির সুযোগ
সরকার জানিয়েছে, উপকারভোগী নির্বাচনে অত্যন্ত কঠোর ও প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।
প্রথমে ৬৭ হাজার ৮৫৪টি নারীপ্রধান পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরে সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রক্সি মিনস টেস্ট (দারিদ্র সূচক) নির্ধারণ করে পরিবারগুলোকে
পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়— হতদরিদ্র, দরিদ্র, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত। যাচাই-বাছাই শেষে ৪৭ হাজার ৭৭৭টি পরিবারের তথ্য সঠিক পাওয়া যায়। ডাবল ভাতা গ্রহণ, সরকারি চাকরি, পেনশনসহ বিভিন্ন কারণে কিছু পরিবার বাদ দিয়ে শেষ পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৫৬৭টি পরিবারকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হয়।
যারা পাবেন না ভাতা: সরকার স্পষ্ট করেছে— যেসব পরিবারে
*সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি আছে
*পেনশন বা বড় সরকারি সুবিধা পাওয়া যায়
*এমপিওভুক্ত শিক্ষক/কর্মচারী আছেন
*বড় ব্যবসা বা বাণিজ্যিক লাইসেন্স রয়েছে
গাড়ি, এসি বা বিলাসবহুল সম্পদ আছে
*৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র রয়েছে
—সেসব পরিবার এই ভাতা পাওয়ার যোগ্য হবেন না।
জুন পর্যন্ত পাইলট প্রকল্পে ৩৮ কোটি টাকা
পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নে জুন ২০২৬ পর্যন্ত মোট ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এর মধ্যে— ২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা (৬৬.০৬%) সরাসরি নগদ সহায়তা। ১২ কোটি ৯২ লাখ টাকা (৩৩.৯৪%) তথ্য সংগ্রহ, সফটওয়্যার ও কার্ড প্রস্তুতসহ বাস্তবায়ন ব্যয়ে ব্যয় হবে।
সরকারের দাবি, পুরো প্রক্রিয়া সফটওয়্যার ও ডিজিটাল যাচাইয়ের মাধ্যমে হওয়ায় দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বা ম্যানুয়াল হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।
