বিগত সরকারের আমলে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) দীর্ঘদিন ধরেই নিয়োগ, অনিয়ম, ও সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত-সমালোচিত ছিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্বচ্ছতা, যোগ্য নেতৃত্ব এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা তৈরি হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও যোগ্য উপাচার্য নিয়োগ ও অনিয়ম রোধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। তবে বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। অভিযোগ উঠেছে—বাউবিতে বর্তমান উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণের পর নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আগের ফ্যাসিবাদী কাঠামো আরও শক্তভাবে পুনর্বাসিত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, আর্থিক লেনদেন এবং রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রধান বিবেচ্য করা হয়েছে। নিয়োগ পরীক্ষা ও ভাইভা কার্যক্রম ছিল কেবল “আইওয়াশ”; কারা নিয়োগ পাবেন তা আগেই নির্ধারিত ছিল।
একই দিনে ভাইভা, বোর্ড সভা ও নিয়োগপত্র—দুর্নীতির স্পষ্ট প্রমাণ : বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক নিয়োগে দেখা গেছে— একই দিনে বিকেলে মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে, সন্ধ্যায় বোর্ড অব গভর্নরস সভায় তা অনুমোদন করা হয়েছে, রাতে নিয়োগপত্র ইস্যু করা হয়েছে এবং পরদিন সকালে যোগদান করানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিয়ম অনুযায়ী যেখানে নিয়োগ যাচাই-বাছাইয়ে দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কথা, সেখানে এই তড়িঘড়ি কার্যক্রম নিয়োগ বাণিজ্যের স্পষ্ট প্রমাণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ উঠেছে—শিক্ষক পদে জনপ্রতি প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা, কর্মকর্তা পদে ২০ লক্ষ টাকা এবং কর্মচারী পদে ১৫ লক্ষ টাকা, ঘুষ লেনদেন হয়েছে।
একই পরিবার থেকে চারজন নিয়োগ : নজিরবিহীন স্বজনপ্রীতি। বিশ্ববিদ্যালয়ে একই পরিবার থেকে চারজন কর্মরত থাকার ঘটনা সামনে এসেছে। সর্বশেষ নিয়োগে ওই পরিবারের একজন কর্মচারীর মেয়ে ও মেয়ের জামাই প্রায় ৪০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে মেডিক্যাল অফিসার পদে নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তাদের বাড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসের বাউন্ডারি সংলগ্ন এলাকায়। বর্তমানে বাউবি ক্যাম্পাস সম্প্রসারণ প্রকল্পে ওই জমি অধিগ্রহণের আওতায় পড়েছে। ফলে যে টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে, তার দ্বিগুণ ফেরত পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে—স্থানীয়দের ভাষায়, “কইয়ের তেলে কই ভাজা”।
ক্যামেরাম্যান থেকে নিয়োগ বাণিজ্যের ‘উজিরে আজম— চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত ক্যামেরাম্যান মেয়র তালুকদার বর্তমানে উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে— নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচনী তহবিল ব্যবস্থাপনায় তিনিই মূল সমন্বয়ক।বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন, পরিচালক থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তার ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পান না। যাকে ইচ্ছা যেখানে বদলি, পদচ্যুত বা কোণঠাসা করা হচ্ছে।
বিএনপি পরিচয়ে উপাচার্য, কিন্তু পুনর্বাসন আওয়ামী নেটওয়ার্কের : বর্তমান উপাচার্য নিজেকে নিরপেক্ষ দাবি করলেও অভিযোগ রয়েছে— জামায়াতপন্থি শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে, অন্যদিকে আওয়ামী ঘরানার কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন করে দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তোলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশলী—গাজীপুর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পুত্র—তাকে বদলি না করে পুনর্বাসন করা হয়েছে।
সংগীতা মোর্শেদ (যুগ্ম পরিচালক), আওয়ামী চেতনার পরিচিত ব্যক্তি—তার স্বামী ৫ আগস্টের পতনের পর পলাতক হলেও তাকেও পুনর্বাসন করা হয়েছে। এগুলোর পেছনে মোটা অংকের ঘুষ বাণিজ্য।
ট্রেজারার ও এফডিআর লভ্যাংশ তছরুপের অভিযোগ :
বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার শামীমের বিরুদ্ধে— এফডিআর লভ্যাংশ তছরুপ, টেন্ডার বাণিজ্য এবং নিয়োগ ঘুষের অর্থ নির্বাচনী ফান্ডে সরানোর অভিযোগ রয়েছে। উল্লেখ্য, ট্রেজারার শামীম জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের পরিচালক হিসেবেও যুক্ত। তার অপসারণ দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে মানববন্ধন করেছে একাধিক ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।
নিয়ম বহির্ভূত গাড়ি ক্রয় ও নির্বাচনী প্রচারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ ব্যবহার : অভিযোগ অনুযায়ী—বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সংকট থাকা সত্ত্বেও ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে উপাচার্য ও ট্রেজারারের জন্য বিলাসবহুল গাড়ি কেনা হয়েছে। এমনকি পুরনো মরিচাধরা গাড়ি নতুন হিসেবে ক্রয়ের মাধ্যমে অর্থ তছরুপের অভিযোগ উঠেছে। এভাবে রাষ্ট্রীয় টাকা চুরির অভিনভ কৌশল মাত্র।
এই গাড়িগুলো ব্যবহার করে উপাচার্য নিয়মবহির্ভূতভাবে বাগেরহাট-৪ আসনে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন।বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি ব্যবহার করে “স্টাডি সেন্টার পরিদর্শনের” নামে রাজনৈতিক সফর চালানো হচ্ছে বলে সুস্পষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কোন আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক বদলি ও তদন্ত— যেসব কর্মকর্তা অন্যায় ও অযৌক্তিক বাজেটের প্রতিবাদ করেছেন— তাদের পদনমন, বদলি বা দায়িত্বহীন করে রাখা হয়েছে।
একজন পরিচালককে জুনিয়র অফিসারের অধীনে সংযুক্ত করা হয়েছে। বিওজি সদস্য এক সহযোগী অধ্যাপক ও ওপেন স্কুলের এক সহকারী অধ্যাপকের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বৈষম্য নিরসনের নামে প্রহসন : উপাচার্য দায়িত্ব গ্রহণের পর বৈষম্য নিরসনের অফিস আদেশ জারি করলেও এক বছরে কোনো বাস্তব অগ্রগতি নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনায়— “একদিনে নিয়োগ শেষ করা যায়, অথচ এক বছরে বৈষম্য নিরসন করা যায় না—নাকি এতেও ঘুষ লাগবে? এমন প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
এদিকে রেজিস্ট্রার পদে আগাম বিজ্ঞপ্তি ও যোগ্যতা শিথিল : পদ শূন্য হওয়ার আগেই রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। রেজিস্ট্রার ও সেকশন অফিসার পদে অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত শিথিল করে নিজস্ব লোক বসানোর অভিযোগ উঠেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরও নিয়োগ কার্যক্রম ও বদলি অব্যাহত রাখা হয়েছে, যা নির্বাচনকালীন বিধি লঙ্ঘনের শামিল।
শেষ কথা : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশ যখন দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের স্বপ্ন দেখছে, তখন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠেছে নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক পুনর্বাসন ও অর্থ তছরুপের নতুন পরীক্ষাগার। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে— “ফ্যাসিবাদী কাঠামো বদলায়নি, শুধু মুখ বদলেছে।”
এখন দেখার বিষয়— শিক্ষা মন্ত্রণালয়, দুদক ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় সংস্থা এই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করবে কিনা, নাকি দেশের সর্ববৃহৎ ওপেন বিশ্ববিদ্যালয়টি দুর্নীতির ভারে আরও গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যাবে।
উল্লেখ্য যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমে যৌথ তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযান চালিয়ে অনিয়ম প্রতিরোধে যথেষ্ট প্রভাব ফেলতে পারে।যা দেশ ও জনমনে তৈরি হবে স্বস্তির আবহ।
