নদ-নদীর নাব্যতা রক্ষা ও নৌপথ সচল রাখার গুরুদায়িত্ব যাদের কাঁধে, সেই বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ-এর ড্রেজিং বিভাগ আজ যেন দুর্নীতির এক অন্ধকার সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে। শত শত কোটি টাকার প্রকল্প কাগজে বাস্তবায়িত হলেও বাস্তবে নদীর বুকে দেখা যায় না তার কোনো প্রতিফলন—বরং উঠে এসেছে ভয়াবহ লুটপাট, জালিয়াতি আর প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দাপট।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ড্রেজিং বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলাম : সংশ্লিষ্টদের দাবি, তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দুর্নীতির চক্র, যারা আরিচা-কাজীরহাট, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া, ভৈরব-আশুগঞ্জ এবং মোংলা-ঘষিয়াখালীসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোকে কার্যত জিম্মি করে রেখেছে।
কাগজে ড্রেজিং, নদীতে নেই কোনো খনন : নথিতে দেখানো হচ্ছে ব্যাপক খনন কার্যক্রম, কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই ড্রেজিং স্পটের অস্তিত্বই নেই। ড্রেজার বন্ধ রেখেই ভুয়া লগবই তৈরি করে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার জ্বালানি তেল উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।
ড্রেজিংয়ের মূল নিয়ম—খননকৃত মাটি নদীর পাড় থেকে দূরে ফেলা—সেটিও মানা হচ্ছে না। বরং মাঝ নদীতেই বালু ফেলে দেওয়া হচ্ছে, যা জোয়ারে আবার আগের স্থানে ফিরে এসে পুনরায় খননের নাটক তৈরি করছে। এতে একই জায়গা বারবার খননের নামে কোটি কোটি টাকার বিল উঠছে।
জ্বালানি চুরি ও ভুয়া বিল সিন্ডিকেটের প্রধান হাতিয়ার :অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জ্বালানি তেল চুরি এই দুর্নীতির সবচেয়ে বড় উৎস। ড্রেজার না চললেও বিল তোলা হচ্ছে নিয়মিত। নিচের স্তর থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত এই অর্থ বণ্টনের অভিযোগ রয়েছে—যা একটি সুসংগঠিত দুর্নীতির চেইনের ইঙ্গিত দেয়। একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখানে প্রতিবাদ মানেই বদলি বা শাস্তি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস কেউ পায় না।
বেসরকারি ড্রেজার ভাড়ায় ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’: সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নিজস্ব ড্রেজার বহর থাকা সত্ত্বেও কেন বেসরকারি ড্রেজারের ওপর এত নির্ভরতা?
অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অলিখিত কমিশন চুক্তির মাধ্যমে বেসরকারি ড্রেজার ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। সরকারি ড্রেজারগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে অচল রাখা হয়, যাতে ভাড়ার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া যায়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বেসরকারি ড্রেজার কাজই না করেও ভুয়া ‘কিউবিক মিটার’ দেখিয়ে বিল পাস করিয়ে নিচ্ছে।
মেরামতের নামে কোটি টাকার কারচুপি- ড্রেজার মেরামত খাতেও চলছে সীমাহীন অনিয়ম। নিম্নমানের বা পুরনো যন্ত্রাংশ নতুন হিসেবে দেখিয়ে বিল করা, এমনকি কোনো যন্ত্রাংশ না কিনেই ভুয়া ভাউচারে টাকা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। কয়েক লাখ টাকার কাজকে কোটি টাকার প্রকল্প বানানো যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যবান তামা, পিতলসহ ভারী যন্ত্রাংশ পাচারের ঘটনাও নতুন নয়।
নাব্যতা সংকটে বিপর্যস্ত নৌপথ- ভুক্তভোগীদের অভিযোগ আরও ভয়াবহ। পদ্মা-যমুনা সংযোগস্থলে প্রায়ই জাহাজ আটকে যাচ্ছে, লঞ্চ মালিকরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। “ড্রেজার চলে, কিন্তু নদীর গভীরতা বাড়ে না”—এই রহস্য এখন আর কারও অজানা নয়।
তদন্তের তোড়জোড়, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে : নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন ইতোমধ্যে নথিপত্র তলবের উদ্যোগ নিয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখছে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা- বিশিষ্ট নদী বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ড্রেজিং প্রকল্প এখন লুটপাটের প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তিগত তদারকি ছাড়া কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। একইভাবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ মনে করে, এই খাতে স্বচ্ছতা আনতে স্বাধীন অডিট ও ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা জরুরি।
উল্লেখ্য যে, নদী বাঁচাতে দুর্নীতি থামানোই এখন শেষ ভরসা। বিআইডব্লিউটিএ’র ড্রেজিং বিভাগ আজ যেন এক আলাদিনের চেরাগ —যেখানে হাত দিলেই বের হয় কোটি টাকার সুযোগ। কিন্তু এই লুটপাটের মূল্য দিচ্ছে দেশের নদী, নৌপথ এবং অর্থনীতি।
তবে এখনই যদি নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহিতা এবং কঠোর শাস্তি নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে নদী খননের নামে এই অর্থলুণ্ঠন চলতেই থাকবে—আর একসময় মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যাবে বহু নদী।
