পাঁচ মাস আগে রাজধানীর মগবাজারে একটি হোটেল কক্ষ থেকে একই পরিবারের তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ঘটনার দিন বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে। মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়ার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। তবে সিআইডির প্রতিবেদনে হত্যা সংক্রান্ত কোনো কিছু পাওয়া যায়নি। তবে আটকে আছে ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে। ঢামেক মর্গে তিনজনের মরদেহ ময়নাতদন্ত করা হয়েছিল। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এখনও হাতে পাওয়া যায়নি। তিনজন হলেন– প্রবাসী মনির হোসেন, তাঁর স্ত্রী নাসরিন আক্তার ও ছেলে নাঈম হোসেন। তাদের মৃত্যুরহস্য এখনও অজানা।
মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ইউনিট। পিবিআই বলছে, মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হতে তারা তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। বিষয়টি ঢামেকের ফরেনসিক বিভাগকে জানানো হয়েছে। তারা মৃত্যুর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করার আগে বোর্ড গঠন করা হবে। এরপর প্রতিবেদন পাবে পুলিশ। মূলত মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের দিকেই তাকিয়ে আছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, কেয়ারটেকার রফিকুল ইসলামকে পিবিআই দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে তিনজনের মৃত্যুর বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। কিন্তু তাঁর কাছ থেকে তেমন তথ্য মেলেনি। তিনি জিজ্ঞাসাবাদের মুখে কর্মকর্তাদের বলেছেন, সকালে মনির হোসেনের ফোন পেয়ে তিনি হোটেলে ছুটে এসেছিলেন। এরপরই দেখেন তারা অসুস্থ। পরে তাদের একে একে উদ্ধার করে পাশেই আদ্-দ্বীন হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তিনজনকে মৃত বলে জানান।
হোটেলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে তা পর্যালোচনা করেছে পিবিআই। মনির হোসেনের কক্ষ থেকে কেয়ারটেকার রফিকুল ইসলাম রাতে বের হয়ে যাওয়ার পর নতুন করে কাউকে প্রবেশ করতে দেখা যায়নি। এ ছাড়া মগবাজার মোড়ে যে রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কিনে মনির, তাঁর স্ত্রী ও ছেলে খেয়েছিলেন, সেই রেস্তোরাঁ থেকেও সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি।
মামলার তদারক কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা মহানগর দক্ষিণের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়ীতা দাস সমকালকে বলেন, তদন্ত অনেকটা অগ্রগতি হয়েছে। তবে আমরা এখনও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাইনি। এর আগে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কিছুই বলা যাচ্ছে না।
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার দেহলা গ্রামের বাসিন্দা মনির হোসেন দীর্ঘদিন সৌদিতে ছিলেন। তাঁর পরিবার থাকত গ্রামের বাড়ি। দেশে আসার পর গত ২৮ জুন অসুস্থ ছেলে নাঈমের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসেন মনির ও তাঁর স্ত্রী। তারা ওঠেন মগবাজার মোড়সংলগ্ন সুইট স্লিপ আবাসিক হোটেলে। মনিরের কেরানীগঞ্জ হাসনাবাদের বাড়ির কেয়ারটেকার রফিকুল ইসলাম রাত ৮টা পর্যন্ত তাদের সঙ্গে হোটেলে ছিলেন। রফিকুল মগবাজার মোড়ে একটি রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কিনে দিয়েছিলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর রাত ১১টার দিকে মনির বাইরে গিয়ে আরও কিছু খাবার ও পানি আনেন। খাবার খাওয়ার পর রাতে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনজনই। পরদিন সকালে মনিরের ফোন পেয়ে রফিকুল ছুটে আসেন। আদ্-দ্বীন হাসপাতালে নিলে তাদের মৃত্যু হয়।
রমনা থানা পুলিশ রফিকুলকে প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদের নামে হেফাজতে নেয়। রফিকুলের মেয়ে ও মেয়ের স্বামীকেও থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তাদের মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে তিনজনের মৃত্যুর ঘটনায় রমনা থানায় হত্যা মামলা হলে রফিকুলকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। মামলার বাদী মনিরের বড় ভাই ইতালী প্রবাসী নুরুল আমিন মানিক।
এজাহারে বলা হয়, মনিরের সম্পত্তি আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী হোটেলে খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে অথবা অন্য কোনো উপায়ে তিনজনকে হত্যা করেছে। পরে মামলাটি পিবিআইয়ে স্থানান্তর করা হয়।
