ছবি: সমতল মাতৃভূমি
রাজধানীর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাড়ে চার বছর বয়সী শিশু আভানের মৃত্যু ঘিরে চিকিৎসায় অবহেলা, রোগ নির্ণয়ে ভুল সিদ্ধান্ত এবং অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, চিকিৎসকদের দায়িত্ব পালনে গাফিলতি ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির কারণে একমাত্র সন্তানটির শারীরিক অবস্থার ক্রমেই অবনতি ঘটে। তবে পরিবারের এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
শিশু আভানের বাবা মৃদুল ইসলাম একজন গণমাধ্যমকর্মী। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকাহত পরিবারটি ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, তদন্তে কারও দায় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৮ সেপ্টেম্বর জ্বর ও পেটে ব্যথা নিয়ে আভানকে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শুরুতে চিকিৎসকরা ডেঙ্গুর আশঙ্কা করে চিকিৎসা শুরু করেন। পরিবারের দাবি, পরবর্তী সময়ে একাধিকবার ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হলেও প্রতিবারই ফলাফল নেগেটিভ আসে। এরপরও শিশুটিকে ডেঙ্গু-সংশ্লিষ্ট কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
আইসিইউতে নেওয়ার পর দ্রুত অবনতি
পরিবারের অভিযোগ, কয়েক দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২ অক্টোবর আভানের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। স্বজনদের দাবি, সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত মূল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সরাসরি উপস্থিত না থেকে ফোনে নির্দেশনা দিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।
পরিবারের ভাষ্য, আইসিইউতে নেওয়ার পর শিশুটির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। এ সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তার অবস্থার উন্নতি হচ্ছে বলে পরিবারকে জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত ৩ অক্টোবর বিকেল ৫টার দিকে আভানের মৃত্যু হয়।
অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন
শিশুটির পরিবার অভিযোগ করেছে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় আভানকে উচ্চমাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছিল। তাদের দাবি, এর পর শিশুটির শরীরে গুরুতর প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং পরবর্তীতে ‘শক সিনড্রোম’-এর মতো জটিলতা তৈরি হয়।
তবে অ্যান্টিবায়োটিকের মাত্রা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যথাযথ ছিল কি না এবং এর সঙ্গে শিশুটির মৃত্যুর কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল কি না—তা কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে চিকিৎসা নথি পর্যালোচনা, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বক্তব্য এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মতামত প্রয়োজন।
চিকিৎসা নথি নিয়েও পরিবারের প্রশ্ন
স্বজনদের অভিযোগ, শিশুটির মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র ও কেস সামারি চাওয়া হলেও শুরুতে তা পেতে তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। পরে চাপের মুখে কিছু প্রয়োজনীয় নথি সরবরাহ করা হয়েছে বলে দাবি করেছে পরিবার।
পরিবারের ভাষ্য, সরবরাহ করা চিকিৎসা নথিতে রক্তে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন এবং শক সিনড্রোমের উল্লেখ রয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে চিকিৎসার বিভিন্ন পর্যায়ে কোনো গাফিলতি, ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি ছিল কি না—তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে স্বজনদের মধ্যে।
‘জাস্টিস ফর আভান’ কর্মসূচির ঘোষণা
ঘটনার পর শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে ‘জাস্টিস ফর আভান’ স্লোগানে দায়ীদের বিচারের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে পরিবার।
তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে—ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, চিকিৎসা নথি পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা, চিকিৎসায় কোনো অনিয়ম বা অবহেলা হয়ে থাকলে দায়ীদের শনাক্ত করা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।
পরিবারের পক্ষ থেকে হাসপাতালের লাইসেন্স ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পেশাগত অনুমোদন বাতিলের দাবিও জানানো হয়েছে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
প্রকৃত কারণ জানতে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি
আভানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী—এখন সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। চিকিৎসার কোন পর্যায়ে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, অ্যান্টিবায়োটিকের মাত্রা ও প্রয়োগ যথাযথ ছিল কি না, আইসিইউতে চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীদের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের ধরন কেমন ছিল এবং হাসপাতালের নির্ধারিত চিকিৎসা প্রটোকল যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ উত্তর প্রয়োজন।
পরিবারের অভিযোগের পাশাপাশি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বক্তব্য, সম্পূর্ণ চিকিৎসা নথি, ওষুধ প্রয়োগের রেকর্ড এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞ মতামত পর্যালোচনা করেই ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে আভানের মরদেহ নিয়ে স্বজনরা গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকাহত পরিবারটির দাবি, কোনো পক্ষের প্রভাব ছাড়াই দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। তদন্তে কারও দায় বা চিকিৎসাগত গাফিলতি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক—এটাই এখন পরিবারের প্রধান দাবি।
