বৃহস্পতিবার, ২২শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৬ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মাসে ৩৭ হাজার টাকা বেতন, সম্পদের পাহাড় শতকোটি! সাবেক ইউপি সচিব মহাসিনের উত্থানে ‘আলাদিনের চেরাগ’

নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবর ২২, ২০২৬ ৩:০৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

১১ বছরের চাকরিজীবনে বিপুল সম্পদের মালিকানা, সন্তানদের পড়াশোনায় মাসে ৯০ হাজার টাকা ব্যয়, সাভার-উত্তরা-কল্যাণপুরে বহুতল ভবন ও ফ্ল্যাট—দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের তদন্ত দাবি। ফাইল ছবি

সরকারি চাকরিতে মাসিক বেতন মাত্র ৩৭ হাজার টাকা। অথচ সন্তানদের পড়াশোনার পেছনেই মাসে ব্যয় প্রায় ৯০ হাজার টাকা। মাত্র ১১ বছরের চাকরিজীবনে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাভারের ধামসোনা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সচিব মহাসিনের বিরুদ্ধে। সরকারি বেতনের সঙ্গে জীবনযাপন, ব্যয় ও সম্পদের এই বিশাল ব্যবধান ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। কীভাবে একজন সাধারণ সরকারি কর্মচারীর হাতে গড়ে উঠল এমন বিপুল সম্পদের সাম্রাজ্য? কোথা থেকে এল বহুতল ভবন, ফ্ল্যাট ও মূল্যবান জমির অর্থ? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মহাসিনের সম্পদ ও আয়ের উৎস নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও অনুসন্ধানী সূত্রের অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে সাবেক চেয়ারম্যানের ছত্রচ্ছায়ায় এবং রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ইউনিয়ন পরিষদকে দুর্নীতির কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন মহাসিন। নকশা অনুমোদন, টেন্ডার, সরকারি প্রকল্পের অর্থ, সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা এবং বিভিন্ন নাগরিক সেবা—এসব খাতকে ঘিরেই তার অবৈধ আয়ের বিস্তার ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নকশা অনুমোদন ঘিরে অর্থ আদায়ের অভিযোগ

স্থানীয় সরকার আইনের বিধান ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে মহাসিনের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে তিনি অবৈধ অর্থ আদায় করতেন।

নকশা অনুমোদনের মতো নাগরিক সেবাকে কেন্দ্র করে এ ধরনের অর্থ আদায়ের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির বিষয় নয়, বরং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় জবাবদিহি ও সেবার স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

টিআর-কাবিখা, ভাতা ও রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ

মহাসিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের পরিধি আরও বিস্তৃত। সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও টিআর ও কাবিখা প্রকল্পের বরাদ্দ, বয়স্ক ও বিধবা ভাতা, ট্রেড লাইসেন্সের ফি এবং নাগরিকদের হোল্ডিং ট্যাক্সের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারি তহবিল ও বিভিন্ন নাগরিক সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থের ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম করে তিনি ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে প্রকল্পের বরাদ্দ, ব্যয়ের নথি, ভাতা বিতরণের তালিকা, ট্রেড লাইসেন্সের হিসাব এবং ইউনিয়ন পরিষদের রাজস্ব আদায়ের রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

এর আগে সাভারের বীরুলিয়া ইউনিয়নে কর্মরত থাকাকালেও টেন্ডারবাজি ও দুর্নীতির অভিযোগে সমালোচিত হয়েছিলেন মহাসিন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। পরে তাকে ধামরাইয়ের চৌহাট ইউনিয়নে বদলি করা হয়। তবে বদলির পরও তার বিরুদ্ধে অবৈধ উপার্জনের অভিযোগ অব্যাহত ছিল বলে অনুসন্ধানী সূত্রগুলো জানিয়েছে।

সাভারে ৯ তলা বাড়ি, উত্তরখানে ৩ তলা ভবন

দীর্ঘদিনের চাকরিজীবনে মহাসিনের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানী সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাভারের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় তার একটি বিলাসবহুল ৯ তলা বাড়ি রয়েছে। রাজধানীর উত্তরার উত্তরখানে রয়েছে ৩ তলা ভবন। এ ছাড়া কল্যাণপুরে একাধিক ফ্ল্যাট এবং ধামরাইয়ে ১৩ শতক মূল্যবান জমির সন্ধান পাওয়ার দাবি করা হয়েছে।

স্থাবর সম্পত্তির পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসায়ও তার বিপুল অর্থ বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে বলে অনুসন্ধানী সূত্রের দাবি। তবে এসব সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস এবং বাজারমূল্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি। সম্পত্তির দলিল, নিবন্ধন নথি, ব্যাংক লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক বিবরণ পর্যালোচনা করলেই অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।

বেতনের সঙ্গে সম্পদের ব্যবধান, তদন্তের দাবি

একজন সরকারি কর্মচারীর বৈধ আয়, পারিবারিক ব্যয় ও সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা প্রত্যাশিত। কিন্তু মহাসিনের ক্ষেত্রে মাসিক বেতন ৩৭ হাজার টাকা, সন্তানদের পড়াশোনায় প্রায় ৯০ হাজার টাকা ব্যয় এবং বিপুল সম্পদের মালিকানার অভিযোগ—সব মিলিয়ে তার আর্থিক সক্ষমতার উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যেন অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করে। তার চাকরিতে যোগদানের সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত আয়-ব্যয়ের হিসাব, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, জমি ও ভবনের দলিল এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

সরকারি পদে থেকে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার আগে নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য গ্রহণ অপরিহার্য।

মহাসিনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার বক্তব্য এবং দুদকের আনুষ্ঠানিক অবস্থান পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। তার ব্যাংক হিসাব, বেনামি সম্পদ ও কথিত ব্যবসায়িক বিনিয়োগের বিস্তারিত তথ্য নিয়ে অনুসন্ধানের পরবর্তী পর্ব শিগগিরই প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রতিবেদনের পরবর্তী পর্বে: কথিত সম্পদের মালিকানা, অর্থের উৎস, ব্যাংক লেনদেন ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগের তথ্য যাচাই করে আরও বিস্তারিত তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চলবে……

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।