হামলার কারণে সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর বন্ধ। এর প্রভাব পড়েছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সৌদি আরবগামী ও ট্রানজিটের ৬০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত হয়েছে। বিমানবন্দরে পৌঁছে এই খবর জানতে পেরে বিপাকে যাত্রীরা। গতকাল মঙ্গলবার তোলা। ছবি: সংগৃহীত
ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার জেরে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ছড়িয়ে পড়েছে নিরাপত্তা-আতঙ্ক। ধারাবাহিক হামলা ও পাল্টা সামরিক অভিযানের আশঙ্কায় শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে বিমান চলাচলেও দেখা দিয়েছে বড় ধরনের বিপর্যয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের আকাশপথে। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত শনিবার রাত থেকে গতকাল মঙ্গলবার রাত সোয়া ৮টা পর্যন্ত সরাসরি ও ট্রানজিট রুটের বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ৮২টি ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ১৩ হাজার ৭১ জন যাত্রী।
পরিস্থিতির মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আগামী শনিবার পর্যন্ত ঢাকা থেকে সৌদি আরবের রিয়াদ ও দাম্মামগামী সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে। ফলে কর্মস্থলে ফিরতে চাওয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশাপাশি বিদেশগামী অন্যান্য যাত্রীরাও পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়।
সৌদি আরবে কর্মস্থলে যোগ দিতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় আসছেন প্রবাসীরা। বিমানবন্দরে পৌঁছে ফ্লাইট বাতিলের খবর জানতে পেরে অনেককেই নতুন করে টিকিট, ভিসার মেয়াদ ও কর্মস্থলে যোগদানের সময় নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা সৌদিপ্রবাসী মো. মাহিরুল বলেন, দুই মাসের ছুটিতে দেশে ফেরার সময়ই ফিরতি টিকিট করেছিলেন। গত রোববার ঢাকা থেকে রিয়াদ যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু বিমানবন্দরে এসে জানতে পারেন, রিয়াদগামী ফ্লাইট বন্ধ।
মাহিরুল বলেন, ‘ফ্লাইট বাতিলের খবরটি আগে থেকে জানতে পারলে ভোগান্তিতে পড়তে হতো না।’
তিনি জানান, পরে ঢাকা থেকে দুবাই হয়ে আল কাসিম যাওয়ার জন্য অন্য একটি এয়ারলাইন্সের টিকিট কেটেছেন। তবে তাঁর ভিসার মেয়াদ প্রায় শেষ। নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারলে সমস্যায় পড়তে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
৮২ ফ্লাইট বাতিল-স্থগিত, বিপাকে হাজারো যাত্রী
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১০টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ১০টি, সৌদিয়ার পাঁচটি এবং রিয়াদ এয়ারের সাতটি ফ্লাইট রয়েছে।
এ ছাড়া ট্রানজিট ফ্লাইটের মধ্যে ইন্ডিগোর ২২টি, সালামের চারটি, ইজিপ্টএয়ারের একটি, এমিরেটসের ১১টি, কাতার এয়ারওয়েজের ছয়টি এবং ফ্লাইদুবাইয়ের ছয়টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব কিংবা সময়সূচি পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
গত সোমবার রাতে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ এক চিঠিতে এ নির্দেশনা দেন। এতে বলা হয়, ফ্লাইটের বিলম্ব, বাতিল কিংবা সময়সূচি পরিবর্তনের তথ্য ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের এসএমএস, ফোনকলসহ বিভিন্ন মাধ্যমে জানাতে হবে, যাতে তাঁরা আগেভাগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন।
এদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আগামী শনিবার পর্যন্ত ঢাকা থেকে রিয়াদ ও দাম্মামগামী সব ফ্লাইট স্থগিত থাকবে।
সানায় তেল স্থাপনা খালি করার নির্দেশ, হুতিদের কঠোর পাল্টা হুমকি
সৌদি নেতৃত্বাধীন যৌথ সামরিক জোট হুতি-নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের রাজধানী সানায় বিশেষ অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছে। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি মানচিত্র প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট এলাকার বেসামরিক নাগরিকদের অবিলম্বে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
জোটের ঘোষণায় বলা হয়েছে, সানার উপকণ্ঠে অবস্থিত ইয়েমেন পেট্রোলিয়াম কোম্পানির আল-সাবাহা সেন্ট্রাল স্টেশনকে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ ঘোষণার পর পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে হুতিরা। গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারিয়া সতর্ক করে বলেছেন, সানায় সৌদি জোট হামলা চালালে রিয়াদে অত্যন্ত কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক জবাব দেওয়া হবে।
এদিকে গতকাল সকালেও রিয়াদ লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সৌদি জোটের দাবি, রাজধানীর উত্তরাঞ্চল লক্ষ্য করে আসা তিনটি ড্রোন আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে। এর পর হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পাল্টা বিমান হামলা চালানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে হুতিরা দাবি করেছে, রিয়াদের পাশাপাশি সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কামিস মুশাইতের একটি বিমানঘাঁটিতেও পৃথক ড্রোন হামলা চালিয়েছে তারা। তবে এসব হামলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।
নিরাপত্তা উদ্বেগে আড়ালে সৌদি যুবরাজ
হুতিদের হামলার মধ্যে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগের খবর সামনে এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় তাঁকে বাংকারের সুবিধাসহ কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত একাধিক প্রাসাদে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪১ বছর বয়সী যুবরাজকে গত মঙ্গলবারের পর থেকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। সেদিন জাতীয় রক্তদান কর্মসূচিতে তাঁকে রক্ত দিতে দেখা গিয়েছিল।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে যুবরাজের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে তাঁর পছন্দ অনুযায়ী বাছাই করা একটি বিশেষ নিরাপত্তা দল। তবে তাঁর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও স্থানান্তর নিয়ে প্রকাশিত সব তথ্যের স্বাধীন নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
শনিবার পর্যন্ত বন্ধ রিয়াদ বিমানবন্দর
হুতিদের ধারাবাহিক হামলার মুখে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ রাখার মেয়াদ আগামী শনিবার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
এদিকে রাজধানীর সড়কগুলোতে কিছুটা স্বাভাবিক চলাচল দেখা গেলেও নিরাপত্তা উদ্বেগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে নগরজীবন ও বিমান চলাচলে অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে।
সৌদি সরকারের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা বিশ্লেষক আলি শিহাবির মতে, বিশাল আয়তনের দেশটিতে অসংখ্য বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা ও পাইপলাইন রয়েছে। একই সঙ্গে এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষার মতো পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বর্তমান পরিস্থিতিতে নাও থাকতে পারে। এ কারণে ফ্রান্স, ব্রিটেন, পাকিস্তান ও মিসরের কাছে অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আগাম সতর্কবার্তা নিয়ে প্রশ্ন, বাড়ছে জনমনে শঙ্কা
রিয়াদে হামলা ও হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। একটি প্রতিবেদনে গত কয়েক দিনের হামলায় ১৮ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হওয়ার দাবি করা হয়েছে। তবে হতাহতের এই সংখ্যা ও ঘটনাগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এর কয়েক দিন আগে সম্ভাব্য সামরিক হামলার বিষয়ে সাধারণ নাগরিকদের সতর্ক করার ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। চলমান উত্তেজনার মধ্যেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখানোর সরকারি প্রচেষ্টা জনমনে উল্টো উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তীব্র বিতর্কের মুখে গত সোমবার সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ রিয়াদ ও দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরগুলোতে নতুন করে সতর্কবার্তা জারি শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
যুদ্ধবিরতি ভাঙার পর নতুন করে সংঘাত
সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংঘাতের শিকড় ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে। ২০১৫ সালে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে সৌদি আরব সামরিক হস্তক্ষেপ করলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত তীব্র হয়। ২০২২ সালে তাদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হলেও সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনায় পরিস্থিতি আবারও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের জুলাইয়ে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যায়। ইরান থেকে আসা একটি উড়োজাহাজ সানার বিমানবন্দরে অবতরণের চেষ্টা করার সময় সৌদি বাহিনী সেখানে হামলা চালিয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে হুতিরা নতুন করে হামলা শুরু করে।
সব মিলিয়ে সৌদি আরব ও ইয়েমেনকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি হামলা, সামরিক অভিযানের হুমকি এবং বিমানবন্দর বন্ধের ঘটনায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এর প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ও প্রবাসী শ্রমিকদের যাতায়াতে। বিশেষ করে সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশিদের নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফেরা, ভিসার মেয়াদ এবং বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত যাত্রীদের ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের সর্বশেষ নির্দেশনা ও ফ্লাইটের অবস্থা নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
