শনিবার, ৭ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

শিক্ষা খাতকে জিম্মি করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন সোহেল! মাউশি যেন ‘মামার বাড়ির ভাগের সম্পত্তি’, ঘুস-বদলি বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তোলপাড়

স্টাফ রিপোর্টার
নভেম্বর ৭, ২০২৬ ১:৩৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

বাড্ডায় সাড়ে সাততলা প্রাসাদ, কক্সবাজারে ফ্ল্যাট ও মেরিন ড্রাইভে প্লট; দুবাইয়ে ১৫ কোটি ও কানাডায় ২৫ কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ—মাধ্যমিক শাখার পরিচালক থাকতেই ৫১ কোটি টাকা অবৈধ আয়ের দাবি। সোহেল। ফাইল ছবি

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের বিরুদ্ধে ঘুস, দুর্নীতি, বদলি বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানকে কার্যত ব্যক্তিগত প্রভাববলয়ে পরিণত করে এমপিওভুক্তি, ফাইল নিষ্পত্তি, শিক্ষক-কর্মচারীদের বদলি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন তিনি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর মাউশির মাধ্যমিক শাখার পরিচালক পদে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ বাড়তে থাকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মাধ্যমিক উইংয়ে যোগদানের পর রিজেক্ট হওয়া শত শত ফাইল অর্থের বিনিময়ে এমপিওভুক্ত করা, যথাযথ তদন্ত ছাড়াই এমপিও স্থগিত ও পুনর্বহাল, ভুয়া তদন্তের নামে অর্থ আদায় এবং বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। শুধু মাধ্যমিক শাখার পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেই তিনি প্রায় ৫১ কোটি টাকা অবৈধভাবে আয় করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে মহাপরিচালকের দায়িত্ব পাওয়ার পর কথিত এই আর্থিক সাম্রাজ্যের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

বাড্ডায় সাড়ে সাততলা প্রাসাদ, জমির মূল্য ১৮ কোটি টাকা!

রাজধানীর বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবনের অদূরে পূর্ব বাড্ডার কৃষি ব্যাংক রোডের পোস্ট অফিস গলিতে ১৮৩১ নম্বর হোল্ডিংয়ে প্রফেসর সোহেলের সুবিশাল সাড়ে সাততলা বাড়ি নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। গুলশান থানার বাড্ডা মৌজার ৩৪৯৬২ নম্বর খতিয়ান ও ১৭২১২ নম্বর দাগে নিবন্ধিত জমির দলিলে মালিক হিসেবে তার নাম রয়েছে বলে জানা গেছে। উন্নতমানের মার্বেল পাথরসহ আধুনিক ফিনিশিংয়ের কাজ চলমান এই বাড়িটির বর্তমান বাজারমূল্য অন্তত ১২ কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

এ ছাড়া একই মৌজার ৩৯৫৯০ নম্বর খতিয়ানের ১৬৭৫ নম্বর দাগে তার মালিকানায় আরও ছয় কাঠা জমি রয়েছে বলে অভিযোগ। যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ছয় কোটি টাকা। শিক্ষা ক্যাডারের কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, বিগত সরকারের আমলে গোপন আঁতাত ও স্কাউটিং কার্যক্রমের আড়ালে অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে তিনি জমিটি কেনেন। পরবর্তীতে মাউশিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাওয়ার পর সেই জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল অট্টালিকা। এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য ও অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কক্সবাজারে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, মেরিন ড্রাইভে ২০ কোটি টাকার প্লট!

মাউশির মহাপরিচালকের দায়িত্বে আসীন হওয়ার পর কক্সবাজারের অভিজাত এলাকা ভিআইপি রোডের ‘পূর্বিতা সুলতানা ভিলা’ নামের ১২ তলা ভবনে ১ হাজার ৭৫০ বর্গফুটের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কেনার অভিযোগ রয়েছে ড. সোহেলের বিরুদ্ধে। কক্সবাজার জেলা শিক্ষা অফিসারের মধ্যস্থতায় কেনা এই ফ্ল্যাটটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় দুই কোটি ১০ লাখ টাকা বলে জানা গেছে।

এখানেই শেষ নয়, সমুদ্রঘেঁষা মেরিন ড্রাইভ স্কয়ারে ভবিষ্যতে রিসোর্ট নির্মাণের পরিকল্পনায় তার অন্তত ২০ কোটি টাকা মূল্যের একটি প্লট রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এত বিপুল মূল্যের স্থাবর সম্পত্তি কীভাবে অর্জিত হয়েছে, তা নিয়ে শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে।

দুবাইয়ে ১৫ কোটি, কানাডায় ২৫ কোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ

দেশে সম্পদের পাহাড় গড়ার পাশাপাশি বিদেশেও বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে মাউশির এই মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট তথ্য এবং তার একাধিক ঘনিষ্ঠ সহচরের সূত্রের বরাতে জানা গেছে, গাজীপুরে নিজস্ব রিসোর্ট ছাড়াও দুবাইয়ে প্রায় ১৫ কোটি টাকা মূল্যের ফ্ল্যাট এবং কানাডায় প্রায় ২৫ কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে তার।

দুর্নীতির অভিযোগের পরিধি আরও বাড়লে তিনি কানাডায় পাড়ি জমাতে পারেন বলেও তার ঘনিষ্ঠজনদের বরাতে দাবি করা হয়েছে। শিক্ষা ক্যাডারের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ড. সোহেলের সম্পদের যে হিসাব সামনে এসেছে, তা প্রকৃত সম্পদের তুলনায় সামান্য হতে পারে। তাদের দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে তার এবং পরিবারের সদস্যদের নামে দেশে-বিদেশে থাকা সম্পদের অনুসন্ধান চালালে বিপুল অঙ্কের অঘোষিত সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। অভিযোগকারীদের আশঙ্কা, অনুসন্ধানে হাজার কোটি টাকার সম্পদের তথ্যও সামনে আসতে পারে।

বিএনপি-জামায়াত থেকে আওয়ামী লীগ, রাজনৈতিক পালাবদলেও সুবিধা অটুট!

১৯৯৬ সালের ১৩ আগস্ট ১৬তম বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে প্রাণিবিদ্যার প্রভাষক হিসেবে কবিরহাট সরকারি কলেজে যোগ দেন সোহেল। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে তৎকালীন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসেবে দায়িত্ব পান। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে যোগদানের মাত্র দুই মাসের মাথায় পদোন্নতি পেয়ে সহকারী অধ্যাপক পদে পদায়ন বাগিয়ে নেন তিনি।

পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরও প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বজায় রেখে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৭ বছরের শাসনামলে মাউশির বিভিন্ন মহাপরিচালকের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে তার বর্তমান ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) ফরহাদ হোসেন মধ্যস্থতা করতেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

বিএনপিপন্থী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্কাউটিং কার্যক্রমের সুবাদে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও ভারতসহ অন্তত ১১টি দেশ সরকারি খরচে ভ্রমণের সুযোগ পান তিনি। একই সময়ে তৎকালীন সরকারের কাছ থেকে আটটি পুরস্কারও বাগিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তন এবং ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পদোন্নতি ও অতিরিক্ত দায়িত্বের মাধ্যমে মাউশির সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন তিনি।

বদলি বাণিজ্যে জিম্মি শিক্ষা ক্যাডার, ক্ষোভে ফুঁসছেন কর্মকর্তারা

মাউশিতে শিক্ষা ক্যাডারের বদলি বাণিজ্য নিয়েও ড. সোহেলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষা ক্যাডারের ১৪তম থেকে ৩০তম বিসিএসের একাধিক কর্মকর্তার দাবি, মাউশিতে এমন কোনো বদলি ছিল না, যা মহাপরিচালক সোহেলের নির্দেশনা এবং আর্থিক লেনদেন ছাড়া সম্পন্ন করা সম্ভব হতো। এমনকি বদলির বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ড. সোহেলের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হতো বলে অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ।

কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বদলি, পদায়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে একটি অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। ফলে যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও প্রশাসনিক প্রয়োজনের পরিবর্তে আর্থিক লেনদেন এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগ প্রাধান্য পেয়েছে বলে তাদের দাবি। এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা শিক্ষা প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম, পেশাগত পরিবেশ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতার জন্য গুরুতর হুমকি।

শত কোটি টাকার সম্পদের উৎস কী, তদন্তের দাবি

রাষ্ট্র যখন জাতীয় স্বার্থে ব্যয় সংকোচন, আর্থিক শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে ঘিরে এত বিপুল সম্পদের অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশ্ন, একজন সরকারি শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা চাকরিজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে কীভাবে দেশে-বিদেশে এত বিপুল সম্পদের মালিক হলেন? তার আয়কর বিবরণী, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক লেনদেন, জমি ও ফ্ল্যাট কেনার দলিল এবং বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের তথ্য যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

তাদের মতে, মাউশিকে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি কিংবা ‘মামার বাড়ির ভাগের অংশ’ হিসেবে পরিচালনার সুযোগ নেই। সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, ফাইল নিষ্পত্তি, এমপিওভুক্তি ও বদলি প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত ঘুস, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, বিদেশে সম্পদ গড়া এবং বদলি বাণিজ্যের অভিযোগের নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে দুদকের পূর্ণাঙ্গ সম্পদ অনুসন্ধান, এনবিআরের আয়কর নথি পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক তদন্ত এখন সময়ের দাবি।

এসব অনিয়মের অভিযোগে বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে………..

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ