বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতির পর পুরোনো কর্মস্থলে ফিরেছেন মনজুরুল আলম শরীফ। পদায়ন নিয়ে অধিদপ্তরে প্রশ্ন, অভিযোগ অস্বীকার কর্মকর্তার। ফাইল ছবি
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রো সার্কেলে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে মনজুরুল আলম শরীফের নতুন পদায়ন ঘিরে অধিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। অতীতে এই একই সার্কেলে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে বিভাগীয় মামলা হয়েছিল। পরবর্তীতে তদন্ত ও শুনানি শেষে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাঁকে ওই মামলা থেকে অব্যাহতি দিলেও পুরোনো কর্মস্থলে নতুন করে পদায়ন নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
গত ২১ জুলাই ২০২৬ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব এ এস এম শাহরিয়ার জাহান স্বাক্ষরিত আদেশে তাঁকে চাঁদপুর জেলা থেকে ঢাকা মেট্রো সার্কেলে বদলি করা হয়। অতীতের অভিযোগ, বিভাগীয় মামলার নিষ্পত্তি এবং বর্তমান পদায়ন—এই তিন বিষয়কে ঘিরে এখন অধিদপ্তরের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
প্রকল্পের বিল নিয়ে অভিযোগ, গড়ায় বিভাগীয় মামলায়
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে ঢাকা মেট্রো সার্কেলে কর্মরত থাকাকালে মনজুরুল আলম শরীফের বিরুদ্ধে কয়েকটি নির্মাণ প্রকল্পে কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই ঠিকাদারদের অতিরিক্ত ও অগ্রিম বিল পরিশোধের অভিযোগ ওঠে।
রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় আইডিয়াল কলেজের আটতলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পে ‘শফিক এন্টারপ্রাইজ’কে ৯৩ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল দেওয়ার অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে মোহাম্মদপুরে নূরজাহান বালিকা বিদ্যালয়ের ছয়তলা ভবন নির্মাণ প্রকল্পে দেড় কোটি টাকা অতিরিক্ত বিল দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।
এ ছাড়া মিরপুরে সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজের খেলার মাঠ ও রাস্তা নির্মাণকাজে ‘অনিতা এন্টারপ্রাইজ’কে ১৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল প্রদানের অভিযোগ সামনে আসে।
এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়। তবে দীর্ঘ তদন্ত, ব্যক্তিগত শুনানি এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনার পর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় ২০২৪ সালের ২৪ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব সোলেমান খান স্বাক্ষরিত আদেশে মনজুরুল আলম শরীফসহ চারজনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
বিভাগীয় মামলায় অব্যাহতির বিষয়টি তাঁর প্রশাসনিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে অভিযোগের প্রেক্ষাপট এবং একই সার্কেলে পুনরায় পদায়নের সিদ্ধান্ত নিয়ে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের মধ্যে প্রশ্ন ও উদ্বেগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
চাঁদপুরে দায়িত্ব পালন ঘিরেও অভিযোগ
মনজুরুল আলম শরীফ চাঁদপুর জেলায় দীর্ঘদিন নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির নির্বাচনী এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে টেন্ডার-বাণিজ্য, কমিশন গ্রহণ এবং ক্ষমতাসীন দলের অনুসারী ঠিকাদারদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।
এ ছাড়া রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে প্রশাসনিক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন—এমন দাবিও করেছেন একাধিক সূত্র। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলার মাধ্যমে নিজের অবস্থান সুসংহত করার চেষ্টা করছেন বলেও অধিদপ্তরের বিভিন্ন মহলে গুঞ্জন রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত অনিয়ম হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
পুরোনো কর্মস্থলে প্রত্যাবর্তন, স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
বিভাগীয় মামলায় অব্যাহতি পাওয়ার পর একই সার্কেলে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে মনজুরুল আলম শরীফের পদায়নকে ঘিরে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
তাঁদের প্রশ্ন, অতীতে যেসব প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, সেসব অভিযোগের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই পদে পদায়নের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রশাসনিক মূল্যায়ন করা হয়েছে? একই কর্মস্থলে তাঁর প্রত্যাবর্তন অধিদপ্তরের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর কী প্রভাব ফেলবে?
অন্যদিকে, বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে আইন ও প্রশাসনিক বিধি অনুসারে তাঁর পদায়নের বিষয়টি মূল্যায়ন করাও জরুরি। অভিযোগের অতীত থাকলেই কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
অভিযোগ অস্বীকার নির্বাহী প্রকৌশলীর
বিভাগীয় মামলা, অতীতের অভিযোগ এবং বর্তমান পদায়ন নিয়ে সরাসরি বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুরুল আলম শরীফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, রাজনৈতিকভাবে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অতীতের অভিযোগ ও বর্তমান পদায়ন নিয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (রুটিন দায়িত্বে) মো. তারেক আনোয়ার জাহেদীর বক্তব্য জানতে তাঁর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
নগদ টাকা লেনদেনের ভিডিও ঘিরে আগের বিতর্ক
উল্লেখ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ ও সংস্কারের দায়িত্বে থাকা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো সার্কেলের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলীর নিজ কার্যালয়ে নগদ টাকা লেনদেনের একটি ভিডিও প্রকাশ পাওয়াকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি অধিদপ্তরে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
ভিডিওটি পুরোনো বলে জানা গেলেও তা প্রকাশ্যে আসার পর সংশ্লিষ্ট ঘটনাটি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে ওই কর্মকর্তাকে সিলেট সার্কেলে বদলি করা হয় বলে জানা গেছে।
এমন পরিস্থিতির পর ঢাকা মেট্রো সার্কেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে অতীতের বিভাগীয় মামলা ও অভিযোগের আলোচনায় থাকা একজন কর্মকর্তার পদায়ন নতুন করে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
নতুন পদায়নের পর কী ঘটছে?
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা মেট্রো সার্কেলে যোগদানের পর মনজুরুল আলম শরীফের বিরুদ্ধে আবারও পুরোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তির অভিযোগ উঠছে বলে প্রতিবেদকের কাছে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব নতুন অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ঘটনা, নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এখনো বিস্তারিতভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অতীতের অভিযোগ, বিভাগীয় মামলার নিষ্পত্তি এবং বর্তমান পদায়ন—সবকিছুর পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট নথি, প্রকল্পের বিল-ভাউচার, তদন্ত প্রতিবেদন ও অধিদপ্তরের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা জরুরি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য প্রকাশের দাবি উঠেছে।
পরবর্তী প্রতিবেদনে ঢাকা মেট্রো সার্কেলে যোগদানের পর নতুন করে ওঠা অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথিপত্র এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের বিষয় তুলে ধরা হবে।
চলবে……..
