শোলাকিয়ায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত। ছবি: সংগৃহীত
কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান আজ আবারও সাক্ষী হলো এক অনন্য ধর্মীয় আবেগ, ঐতিহ্য আর মানবসমুদ্রের মিলনের। পবিত্র ঈদুল ফিতরের ১৯৯তম এই জামাতে অংশ নিলেন প্রায় ৬ লক্ষাধিক মুসল্লি—যেন একসঙ্গে উচ্চারিত তাকবিরে মুখরিত হলো পুরো জনপদ।
শনিবার সকাল ঠিক ১০টায়, বহু পুরনো রেওয়াজ অনুযায়ী বন্দুকের গুলির ধ্বনিতে শুরু হয় জামাত। সেই ধ্বনি যেন ঘোষণা দেয়—ঐতিহ্য এখনো জীবন্ত, বিশ্বাস এখনো অটুট। ইমামতি করেন বড়বাজার জামে মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ, যার কণ্ঠে উচ্চারিত দোয়ায় অশ্রুসিক্ত হয় অসংখ্য হৃদয়।
ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসল্লিদের ঢল নামে শোলাকিয়ার পথে। ময়মনসিংহ ও ভৈরব থেকে ছুটে আসে বিশেষ ট্রেন—ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে হাজারো মানুষ একসঙ্গে যাত্রা করে এই ঐতিহ্যের টানে। ময়দান ভরে গেলে আশপাশের রাস্তা, ছাদ, পুকুরপাড়, এমনকি সেতুতেও গড়ে ওঠে নামাজের কাতার—দৃষ্টিনন্দন এক আধ্যাত্মিক চিত্রপট।
এদিকে শোলাকিয়ার শতবর্ষের রীতিতে, জামাত শুরুর আগে ধাপে ধাপে ছোড়া হয় শটগানের গুলি—১০ মিনিট আগে ৫টি, ৫ মিনিট আগে ৩টি, আর ১ মিনিট আগে ২টি। প্রথম গুলিটি ছোড়েন পুলিশ সুপার ড. এসএম ফরহাদ হোসেন—যেন সময়ের কণ্ঠে বাজে প্রস্তুতির চূড়ান্ত সঙ্কেত। নিরাপত্তার চাদরে মোড়া ছিল পুরো ঈদগাহ এলাকা। ৬৪টি সিসি ক্যামেরা, ১১০০ পুলিশ সদস্য, সেনা, বিজিবি, র্যাব, আনসার—সব মিলিয়ে গড়ে তোলা হয় চার স্তরের কঠোর নিরাপত্তা বলয়। পাশাপাশি ছিল মেডিকেল টিম, ফায়ার সার্ভিস ও পৃথক কন্ট্রোল রুম—সবকিছু মিলিয়ে নিখুঁত ব্যবস্থাপনা।
ঈদের আনন্দকে ঘিরে ঈদগাহের পাশেই বসে গ্রামীণ মেলা। নামাজ শেষে শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে খেলনা আর কাঠের তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রী কেনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন অনেকে। সেই সঙ্গে বিদেশি কৌতূহলও—চীনা পর্যটকদের উপস্থিতি এই আয়োজনকে দিয়েছে আন্তর্জাতিক নতুন মাত্রা। ইবাদত, ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে সাজিয়ে তোলা হয়েছিল আনন্দের পসরা।
জামাতের আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম মুসলিম বিশ্বের ওপর চলমান নির্যাতনের তীব্র নিন্দা জানান এবং শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য দোয়া কামনা করেন। তিনি দেশ ও জাতির কল্যাণে ঐক্যের আহ্বান জানান।
সবশেষে মোনাজাতে ইমাম আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ সমগ্র মুসলিম উম্মাহর শান্তি, অগ্রগতি ও কল্যাণ কামনা করেন। সেই দোয়ায় যেন মিশে ছিল বিশ্বমানবতার জন্য এক গভীর আবেদন। শোলাকিয়া আবারও প্রমাণ করলো—এটি শুধু একটি ঈদ জামাত নয়, এটি এক অদম্য ঐতিহ্য, একাত্মতার প্রতীক, আর বিশ্বাসের স্থান।
