মঙ্গলবার, ৩রা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

সরকারি দুই হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধের শঙ্কা, চুক্তির মেয়াদ শেষ, যন্ত্র কেনায় জটিলতা—সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়বেন স্বল্প আয়ের রোগীরা

স্টাফ রিপোর্টার
নভেম্বর ৩, ২০২৬ ১১:০১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউট

সরকারি দুই হাসপাতালে দরিদ্র কিডনি রোগীদের জন্য বিনামূল্যে ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় তৈরি হয়েছে এই অনিশ্চয়তা। বিকল্প হিসেবে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় ডায়ালাইসিস যন্ত্র কেনার প্রক্রিয়ায় দেখা দিয়েছে নানা জটিলতা।

ইতোমধ্যে দুই দফা দরপত্র বাতিল হয়েছে। তৃতীয় দফার দরপত্রে অস্বাভাবিক কিছু শর্ত যুক্ত করায় নিম্নমানের যন্ত্র সরবরাহের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে আপত্তি তুলেছে পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, কেনাকাটার পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে আরও পাঁচ থেকে ছয় মাস সময় লাগতে পারে। ফলে এই দীর্ঘ সময়ে রোগীরা কোথায় এবং কীভাবে ডায়ালাইসিস সেবা পাবেন, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়বেন স্বল্প আয়ের রোগীরা।

চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২৯ নভেম্বর

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় ২০১৭ সালের ৪ মার্চ থেকে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান স্যান্ডরের মাধ্যমে ঢাকার জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউট এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) ডায়ালাইসিস সেবা চালু হয়। এ দুই হাসপাতালে ১০১টি ডায়ালাইসিস যন্ত্রের মাধ্যমে রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে।

আগামী ২৯ নভেম্বর ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সরকারের ১০ বছর মেয়াদি চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এরপর সেবা কীভাবে চালু থাকবে, তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

স্যান্ডরের সহকারী ব্যবস্থাপক তায়েফ রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত সরকার থেকে চুক্তি নবায়ন বা এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সময়ে রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দীন সমকালকে বলেন, নতুন ডায়ালাইসিস যন্ত্র কেনাসহ যাবতীয় প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে নতুন মেশিন স্থাপনসহ সব কার্যক্রম শেষ করতে পাঁচ থেকে ছয় মাস সময় লাগবে।

দুই দফা দরপত্র বাতিল, তৃতীয় দফায় নতুন শর্ত

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর এক হাজার ৩০টি ডায়ালাইসিস যন্ত্র কেনার জন্য প্রথমবার দরপত্র আহ্বান করে। এ জন্য বাজেট ধরা হয় ২৬৭ কোটি টাকা। দরপত্রে ৭০ কোটি টাকার কাজের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসনের (এফডিএ) অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়।

তবে কোনো কারণ ছাড়াই ওই দরপত্র বাতিল করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এরপর ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর দ্বিতীয় দফায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। এবার কাজের অভিজ্ঞতার শর্ত ৭০ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে এক কোটি ৫০ লাখ টাকা করা হয়। তবে বাকি শর্তগুলো অপরিবর্তিত রাখা হয়। দ্বিতীয় দফার দরপত্রে চারটি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে। কিন্তু কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে না পারায় এবারও দরপত্র বাতিল হয়ে যায়।

বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তৃতীয়বারের মতো ডায়ালাইসিস যন্ত্র কেনার এপিপি (বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা) অনুমোদন করা হয়। এ সময় নতুন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় অধ্যাপক ড. আ ন ম এহসানুল করীমকে।

তৃতীয় দরপত্রে অভিজ্ঞতার শর্ত ১৬০ কোটি টাকা

সর্বশেষ দরপত্রে আবারও শর্ত পরিবর্তন করা হয়েছে। এবার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ১৬০ কোটি টাকার কাজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি অন্তত এক হাজার ডায়ালাইসিস যন্ত্র স্থাপন ও সরবরাহের অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, যন্ত্রের মনিটরের আকার ১৫ ইঞ্চি থেকে কমিয়ে ১০ ইঞ্চি করা হয়েছে। এ ছাড়া যন্ত্রের সঙ্গে ব্যবহারের জন্য আগে একটি ডায়ালাইজার চাওয়া হলেও তৃতীয় দফার দরপত্রে তা বাড়িয়ে দুটি করা হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে সরকারের ব্যয়ও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ক্রয়বিষয়ক নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন নিয়মে কাজ পেতে আগের কাজের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক নয়। আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত দরপত্র জমা দেওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে তৃতীয় দফার দরপত্রে অস্বাভাবিক শর্ত যুক্ত করার অভিযোগ তুলে আপত্তি জানিয়েছে পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তাদের দাবি, সব শর্ত পূরণ করে দেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দরপত্রে অংশ নেওয়া কঠিন। তাদের ধারণা, জাপানের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত একটি কোম্পানি এ ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে।

শর্ত পরিবর্তনের কারণ নিয়ে প্রশ্ন

তৃতীয় দফার দরপত্রে হঠাৎ এত শর্ত পরিবর্তন বা যুক্ত করার কারণ জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. আ ন ম এহসানুল করীম বলেন, ‘আমি এখন রোগী দেখছি। প্লিজ, পরে ফোন দিয়েন।

পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর সাড়া দেননি।

আর্থিক সুবিধার অভিযোগ, ভোগান্তি রোগীদের

জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, যন্ত্র কেনাকাটায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের দক্ষতার অভাব নেই। এর জন্য দায়ী রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা। আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে তাদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে বিভিন্ন শর্ত আরোপ করা হয়। এতে যোগ্য প্রতিষ্ঠান বাদ পড়ে। ভোগান্তি পোহাতে হয় রোগীদের।

স্যান্ডরের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করবে না সরকার

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল সমকালকে বলেন, নতুন করে সরকার ভারতীয় প্রতিষ্ঠান স্যান্ডরের সঙ্গে করা অসম চুক্তি আর নবায়ন করবে না। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, যন্ত্র কেনার প্রক্রিয়ায় গতি ফেরাতে কাজ চলছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছেন তিনি।

তবে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন যন্ত্র কেনা ও স্থাপনের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ফলে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডায়ালাইসিস সেবার ওপর নির্ভরশীল দরিদ্র রোগীদের সামনে তৈরি হয়েছে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।