সরকারি চাকরি থেকে অবসরে গেলেও ক্ষমতার ছায়া যেন তাকে ছাড়েনি। কাজী ওয়াছি উদ্দিন—নিজেকে বরাবর ‘সৎ কর্মকর্তা’ হিসেবে তুলে ধরলেও, তার নাম ঘিরে এখন ঘুরপাক খাচ্ছে প্রভাব, সিন্ডিকেট,বিলাসবহুল বাসভবন আর রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহারের এক বিস্ময়কর কাহিনি।
ক্ষমতার দাপটে উত্থান- গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি উপজেলার গ্রামের পরিচয়—সেটিই ছিল তার শক্তির মূল ভিত্তি, এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। ২০২০ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়-এ অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদায়ন। এরপর ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২—গণপূর্ত সচিবের আসনে বসা। চাকরির বয়স শেষ হলেও চুক্তিভিত্তিক এক বছরের বর্ধিত নিয়োগ—ক্ষমতার ধারাবাহিকতা যেন থামেনি।
তার আগে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়-এ দীর্ঘ সময় যুগ্মসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একটি বড় প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বও নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। অভিযোগ—সেখান থেকেই শুরু ‘তলে তলে’ সিন্ডিকেট গঠন, নিয়োগ-বদলি ও টেন্ডার প্রভাবের খেলা।
সচিবালয়ে সিন্ডিকেটের ছায়া : গণপূর্ত সচিব থাকাকালে গোপালগঞ্জের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে তোলেন—এমন অভিযোগ একাধিক সূত্রের। সরকারি বাড়ি দখল, প্লট বাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, এমনকি চাঁদাবাজির মতো অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে সচিবের দপ্তর থেকেই এক ভুয়া ডিজিএফআই পরিচয়ধারী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে জানা যায়, তিনি নাকি সচিবের ‘দালাল’ হিসেবেই কাজ করতেন।
সাব-স্টেশন থেকে বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স- সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ—রাজধানীর বেইলী রোডে মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট-৩ সংলগ্ন গণপূর্তের বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন ভবন। সরকারি নথিতে ‘সাব-স্টেশন’—কিন্তু বাস্তবে সেটি রূপ নিয়েছে আট কক্ষবিশিষ্ট বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাংলোয়। এখন ভবনটি পরিচিত “বেইলী রোড মন্ত্রীপাড়া ৪০ নম্বর বাড়ি” নামে। আধুনিক রিনোভেশন, দামী ফার্নিচার, অভিজাত সজ্জা—সূত্র বলছে, সংস্কার ও আসবাবে ব্যয় প্রায় ৩ কোটি টাকা।
প্রশ্ন জাগে—কোন অনুমতিতে একটি সরকারি সাব-স্টেশন ভবন ব্যক্তিগত আবাসে রূপান্তর হলো? কোন বিধিবলে এই বিপুল অর্থ ব্যয়?
৫০ হাজার টাকার বাসা, ভাড়া মাত্র ৪ হাজার!
নিয়ম অনুযায়ী যার ভাড়া হওয়া উচিত ছিল প্রায় ৫০ হাজার টাকা মাসিক, সেখানে বেতন থেকে কাটা হয়েছে মূল বেতনের মাত্র ৭.৫ শতাংশ। ফলাফল—মাসে প্রায় ৪ হাজার টাকা ভাড়া!
অথচ একই বাসায় আগে বসবাসকারী এক নির্বাহী প্রকৌশলী মাসে প্রায় ২৬ হাজার টাকা ভাড়া দিতেন বিধি অনুযায়ী। একই ভবন, বাড়তি সংস্কার, বিলাসবহুল রূপ—তবু ভাড়া কমে গেল হাজারে হাজারে!
পিআরএল শেষ, দখল অব্যাহত : তার পিআরএল শুরু ১০ মার্চ ২০২৪। নিয়ম অনুযায়ী ৯ মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত সরকারি বাসায় থাকার সুযোগ ছিল। বিশেষ বিবেচনায় অতিরিক্ত কিছু সময়ও দেওয়া যায়। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়েও তিনি এখনো সেই বাংলোয় অবস্থান করছেন—এমন অভিযোগ।
প্রশ্ন উঠছে—কোন প্রশাসনিক নির্দেশে? কেন সংশ্লিষ্ট দপ্তর নীরব?
ব্যক্তিগত সম্পর্ক, টেন্ডার প্রভাব ও বিতর্ক
অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত সচিব থাকাকালে এক নারী ঠিকাদারের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। পরে তাকে বিয়ে করে একই বাংলোয় বসবাস শুরু করেন। প্রশাসনের ভেতরে ফিসফাস—এই সম্পর্ক ঘিরেই নাকি টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তারের নানা ঘটনা ঘটেছে। তবে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাননি কেউ।
১৮ বছরের কারাদণ্ড—তবুও প্রশ্ন- অবৈধ প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত মামলায় আদালত তাকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন—এমন তথ্যও সামনে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—দণ্ডিত একজন সাবেক সচিব কীভাবে এখনও সরকারি বাংলোয় অবস্থান করেন? রাষ্ট্রীয় অর্থে সংস্কার করা বাসভবনে তার বসবাসের আইনি ভিত্তি কী?
রাষ্ট্রের ক্ষতি কত?
ভাড়ার পার্থক্য, অবৈধ দখল, সংস্কার ব্যয়—সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা সংশ্লিষ্ট মহলের।
একদিকে সাধারণ সরকারি কর্মচারীরা নিয়ম মেনে উচ্চ দেন, অন্যদিকে একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা নামমাত্র ভাড়ায় বিলাসবহুল বাংলোয় থাকেন—এ বৈষম্য কি কেবল ব্যক্তির, নাকি ব্যবস্থারও?
উল্লেখ্য কাজী ওয়াছি উদ্দিন কি কেবল একজন ব্যক্তি, নাকি ক্ষমতা-নির্ভর এক ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি?
সরকারি সাব-স্টেশন ভবনকে ব্যক্তিগত প্রাসাদে রূপান্তর, বিধিবহির্ভূত ভাড়া নির্ধারণ, অবসরের পরও দখল—এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
না হলে প্রশ্ন থেকেই যাবে—রাষ্ট্র কি এখনও তার ছায়া থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি?
