দীর্ঘ ১৮ মাসের পটপরিবর্তনের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেন সিলেটবাসীর জন্য হয়ে উঠেছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ভোটকেন্দ্রে ছিল স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি, আর ব্যালট বাক্সে ফুটে উঠেছে এক স্পষ্ট বার্তা—‘স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি’ হিসেবে এবার বেছে নেওয়া হয়েছে বিএনপিকে। ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতেই ধানের শীষের নিরঙ্কুশ জয় সিলেটের রাজনৈতিক সমীকরণ আমূল বদলে দিয়েছে।
স্থানীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে তৃণমূল ভোটার, চা শ্রমিক, পাহাড়ি জনপদের মানুষ ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভোট একত্রে গিয়ে তৈরি করেছে বিএনপির বিজয়ের ভিত্তি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান–এর আদর্শের প্রতি আস্থাই নাকি এই ফলাফলের মূল শক্তি।
সিলেট-১: মর্যাদার আসনে বড় ব্যবধান
রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিলেট-১ আসনে বিএনপির খন্দকার মোক্তাদির হোসেন জয় পেয়েছেন ৪১ হাজারেরও বেশি ভোটে। তিনি পেয়েছেন ১,৭৬,৯৩৬ ভোট, আর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান পেয়েছেন ১,৩৪,৯৮৩ ভোট। প্রচারণায় নীরব থাকলেও ভোটের দিন চা শ্রমিক ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে ফলাফলে।
সিলেট-২: লুনার ঝড়
গুম হওয়া নেতা এম ইলিয়াস আলীর সহধর্মিণী তাহসিনা রুশদীর লুনা সিলেট-2-এ প্রায় ৭৯ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ১,১৭,৯৫৬ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বী খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ মুনতাছির আলী পান মাত্র ৩৮,৬৩৫ ভোট। এই আসনে সহানুভূতি ও সংগঠিত ভোট—দুই মিলেই তৈরি হয়েছে বিশাল ব্যবধান।
সিলেট-৩: প্রবাসী নেতৃত্বের বাজিমাত
যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি মো. আব্দুল মালিক পেয়েছেন ১,১৫,৩৪৫ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মুসলেহ উদ্দিন রাজু পান ৭২,৪০৯ ভোট। প্রায় ৪৩ হাজার ভোটের ব্যবধান মাঠে দেখিয়ে দেয় কতটা দৃঢ় ছিল বিএনপির অবস্থান।সিলেট-৪: ব্যাকফুট থেকে ফ্রন্টফুট
সাবেক সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী শুরুতে চাপে থাকলেও শেষ পর্যন্ত জিতেছেন বিশাল ব্যবধানে। প্রতিদ্বন্দ্বী জয়নাল আবেদীনের চেয়ে তিনি ১ লাখ ১৫ হাজার বেশি ভোট পেয়েছেন। প্রচারণায় কোণঠাসা হলেও ভোটের বাক্সে তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য।
সিলেট-৫: বিদ্রোহীর প্রভাব, অল্পের জয়
এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মামুনুর রশিদ মামুন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামায় সমীকরণ জটিল হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত খেলাফত মজলিসের মুফতি আবুল হাসান ৭৫,৮২১ ভোট পেয়ে জয় পান। জমিয়তের উবায়দুল্লাহ ফারুক পান ৬৯,৬৪৪ ভোট। ব্যবধান মাত্র ছয় হাজারের কিছু বেশি—যা নিয়ে তৃণমূল বিএনপির মধ্যে রয়েছে আক্ষেপ।
সিলেট-৬: সেয়ানে সেয়ানে লড়াই
একমাত্র এই আসনেই ছিল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। শেষ পর্যন্ত বিএনপির এমরান আহমদ চৌধুরী প্রায় ৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে জামায়াতের মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনকে হারান। বাকিগুলোতে বিএনপির প্রার্থীরা ছিলেন কার্যত অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
তৃণমূল ভোটই গেমচেঞ্জার?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, আওয়ামী লীগের তৃণমূল সমর্থক ও সচেতন ভোটারদের একটি বড় অংশ বিএনপির প্রতীকে ভোট দিয়েছেন। সীমান্তবর্তী পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ও চা বাগানের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ভোটব্যাংকেও এসেছে বড় পরিবর্তন। ফলে যে এলাকাগুলো আগে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখানেও এবার ধানের শীষের জয়ধ্বনি শোনা গেছে।
সিলেট জেলা বিএনপির নেতারা বলছেন, “স্বাধীনতার স্বপক্ষে রায় এসেছে জনগণের ভোটে।” তাদের মতে, উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রত্যাশাই এই ভূমিধস বিজয়ের মূল চালিকা শক্তি।
বদলে যাওয়া বার্তা
সিলেটের ছয় আসনের পাঁচটিতে বিএনপির এই জোয়ার শুধু আসনজয় নয়—এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা। দীর্ঘ সময় পর আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে ভোটাররা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।ফলাফল বলছে, সিলেটে এবার ‘স্বাধীনতার শক্তি’র প্রতীক হয়ে উঠেছে ধানের শীষ।
