বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

‘হামলা, ভাঙচুর ও আগুনে ধ্বংসস্তূপ ছায়ানট, “ছয়তলা ভবনের প্রতিটি কক্ষ তছনছ, ল্যাপটপ ও হার্ডডিস্ক লুট”

স্টাফ রিপোর্টার
ডিসেম্বর ২০, ২০২৫ ৭:৪৬ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটে হামলার ঘটনায় গতকাল শুক্রবার বিকেলে সম্মিলিত কণ্ঠে জাতীয় সংগীতসহ কয়েকটি গান গেয়ে প্রতিবাদ জানান নালন্দা ও ছায়ানট বিদ্যায়তনের বর্তমান-প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংস্কৃতিকর্মীরা -সমতল মাতৃভূমি

মেঝের সবুজ কার্পেটের ওপর পড়ে আছে পুড়িয়ে দেওয়া হারমোনিয়াম, তবলা। ভেঙে চুরমার তানপুরা, মাইক্রোফোন স্ট্যান্ড। পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গানের স্বরলিপি, খাতা। দেয়ালে ঝুলছে ভাঙচুর করা চিত্রকর্ম। ভাঙা আলমারি, চেয়ার-টেবিল, পোড়ানো নথিপত্র– সব যেন একসঙ্গে সাক্ষ্য দিচ্ছে ধ্বংসযজ্ঞের।

গতকাল শুক্রবার সকালে এমন চিত্র দেখা যায় রাজধানীর ধানমন্ডির সাংস্কৃতিক ও সংগীত ঐতিহ্যের ধারক ছায়ানট ভবনে। ছয়তলা ভবনটির প্রতিটি তলায় প্রায় প্রতিটি কক্ষ-মিলনায়তনের ছিল একই অবস্থা। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে একদল লোকের হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর নিচতলা থেকে শুরু করে ষষ্ঠ তলার লাইব্রেরি পর্যন্ত কোথাও কোনো জিনিসপত্র অক্ষত নেই। বিশেষ করে হারমোনিয়াম, তবলা, সেতার, তানপুরার মতো বাদ্যযন্ত্র যেন ছিল হামলাকারীদের লক্ষ্যবস্তু।

ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমেদ লিসা গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থলে সমকালকে বলেন, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে ছায়ানটের সম্পর্ক কোথায়? এই হামলার কারণ কী? আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানাই।

সংস্কৃতি ভবনে হামলা, ভাঙচুর ও লুটতরাজের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে ছায়ানট কর্তৃপক্ষ। এক বিবৃতিতে গতকাল বলা হয়, সার্ভারসহ কিছু বাদ্যযন্ত্র ও আসবাব পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া সাতটি ল্যাপটপ, কয়েকটি মোবাইল ফোন ও কিছু হার্ডডিস্ক লুট করা হয়েছে।

গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, ভবনের প্রথম তলায় একটি ডেস্কের ওপর ভাঙা হারমোনিয়াম স্তূপ করে রাখা হয়েছে। পড়ে আছে ভাঙা চেয়ার, উল্টানো আর্চওয়ে, পুড়ে যাওয়া বিশেষ আসন। খাতাপত্র রাখার আলমারি ভেঙে সব লন্ডভন্ড করা হয়েছে। দোতলায় মিলনায়তন ও অফিস কক্ষ তছনছ করা হয়েছে। ক্যান্টিনের খাবার সরঞ্জাম ফেলে দেওয়া হয়েছে। ভাঙা হয়েছে সাধারণ সম্পাদকের কক্ষ ও বিদ্যায়তন কার্যালয়।এখানে দুটি কক্ষের দেয়ালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বড় ছবি বাঁধাই করা ছিল। রবীন্দ্রনাথের ছবিটি ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। তৃতীয় থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত মূলত শ্রেণিকক্ষ।

তৃতীয় তলায় শ্রেণিকক্ষসহ রমেশ চন্দ্র দত্ত স্মৃতি মিলন কেন্দ্রে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। এই তলার নারী শৌচাগারও ভাঙচুর করেছে হামলাকারীরা। চতুর্থ তলায় আবদুল মালেক চৌধুরী স্মৃতিকক্ষ, শামসুন্নাহার আহমেদ স্মৃতিকক্ষসহ ৪০১, ৪০৪, ৪০৫, ৪০৮, ৪০৯ ও ৪১০ নম্বর কক্ষ তছনছ করা হয়েছে। ভাঙচুরের পাশাপাশি তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় বাদ্যযন্ত্র, নথিপত্র এবং আসবাবে আগুন দেওয়া হয়েছে। ষষ্ঠ তলায় থাকা লাইব্রেরিতে ভাঙচুর করে কিছু বই পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

যেভাবে হামলা

‘রাত ১টা ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের দিকে পার্কিং লটের দিকে বেশ কিছু মানুষ কাঠ জড়ো করে আগুন ধরিয়ে দেয়। তারা কিছুক্ষণ থেকে চলে যায়। তবে এর ১০ মিনিটের মাথায় পার্কিং লট ও মূল দরজা ভেঙে ভবনের ভেতরে ঢোকে শতাধিক মানুষ। তাদের হাতে ছিল লাঠিসোটা। প্রথমেই তারা সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো ভেঙে ফেলে। এরপর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। রাত আড়াইটার দিকে বেরিয়ে যায় হামলাকারীরা।’ এভাবেই হামলার ঘটনার বর্ণনা দেন ছায়ানট ভবনের অদূরে থাকা এক প্রত্যক্ষদর্শী।

রাত সাড়ে ৩টার দিকে ছায়ানট কর্তৃপক্ষ তাদের ফেসবুক পেজে দেওয়া ঘোষণায় বিদ্যায়তনের ক্লাসসহ সব কার্যক্রম অনিবার্য কারণে স্থগিত রাখার কথা জানায়।

এদিকে গতকাল সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এক বিবৃতিতে বলেন, কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠনের ওপর এ ধরনের হামলা শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়, বরং এটি দেশের বহুত্ববাদী ও গণতান্ত্রিক চেতনাকে ধ্বংসের গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ।

ছায়ানটে হামলার প্রতিবাদে গতকাল বিকেলে জাতীয় সংগীত ও গণসংগীতে মুখর হয়ে ওঠে ভবনের সামনের প্রাঙ্গণ। নালন্দা ও ছায়ানট বিদ্যায়তনের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সংস্কৃতিকর্মীদের উদ্যোগে কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

অন্যদিকে দেশে সাম্প্রতিক সহিংসতা ও ধারাবাহিক নিরাপত্তা ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। গতকাল দুপুরে ছায়ানটের সামনে অবস্থান নিয়ে তারা সাম্প্রতিক হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানান। কর্মসূচিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, আইনজীবী মানজুর আল মতিনসহ বিশিষ্টজনরা উপস্থিত ছিলেন।

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ভাঙচুর

শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বৃহস্পতিবার রাতে আবারও ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। গতকালও দিনভর ভবনটি ভাঙতে দেখা যায় বিক্ষোভকারীদের।

উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়ে আগুন

রাজধানীর তোপখানা রোডের উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়েও আগুন দেওয়া হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় আগুন দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির একাংশের সাধারণ সম্পাদক জামশেদ আনোয়ার তপন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সন্ধ্যা ৭টার দিকে এক দল লোক এসে কার্যালয়টি ভাঙচুর করে ও অগ্নিসংযোগ করে। আগুন লাগার পর কার্যালয়ের ভেতরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।