ঢাকা কাস্টম হাউসের প্রিভেন্টিভ শাখার উপকমিশনার মো. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকি, ভুয়া কাগজপত্রে পণ্য খালাস, ঘুষ গ্রহণ, চোরাচালানে সহযোগিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে সোহেল রানা নামে এক ব্যক্তি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), অর্থ মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত আবেদন করেছেন।
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর অংশটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো কমপ্লেক্সকে ঘিরে। আবেদনে দাবি করা হয়েছে, একটি এয়ারওয়ে বিলের বিপরীতে প্রায় ৫৬ কার্টন পণ্য নিয়মিত বিল অব এন্ট্রি ও কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ছাড়াই কার্গো এলাকা থেকে বের করে নেওয়া হয়েছে। পণ্যগুলোর ওজন আনুমানিক ১ হাজার ৯৬২ কেজি এবং অভিযোগকারীর হিসাবে মূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা।
অভিযোগ অনুযায়ী, চালানটিতে মোবাইল ফোন, মোবাইল ফোনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, এলসিডি, ই-সিগারেট এবং সিগারেটের ব্যান্ডেরোল বা সরকারি রাজস্ব স্ট্যাম্পজাতীয় পণ্য থাকতে পারে। নিয়মিত শুল্ক-কর ও কাস্টমস প্রক্রিয়া ছাড়াই এসব পণ্য খালাস হয়ে থাকলে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিসিটিভি ও কার্গো রেকর্ড যাচাইয়ের দাবি
ঘটনার প্রকৃত চিত্র উদঘাটনে কার্গো এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ, গেট পাস, ডেলিভারি রেকর্ড, ওয়্যারহাউস ইনভেন্টরি, কার্গো মুভমেন্ট, এয়ারওয়ে বিল, বিল অব এন্ট্রি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডিউটি রোস্টার যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।
আবেদনে কয়েকটি বন্ধ বা কার্যক্রমহীন বন্ড প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে ভুয়া বা অসঙ্গতিপূর্ণ নথির মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য খালাসের অভিযোগও আনা হয়েছে। কোন প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্য আমদানি হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তখন কার্যকর ছিল কি না, বন্ড সুবিধা বহাল ছিল কি না এবং আমদানির পর পণ্য কোথায় গেছে, এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
শিশুখাদ্য, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন পণ্য প্রয়োজনীয় বিএসটিআই বা অন্যান্য বাধ্যতামূলক অনুমোদন ছাড়াই প্রভাব খাটিয়ে খালাসের অভিযোগও করা হয়েছে। এসব অভিযোগ যাচাইয়ে আমদানি নথি, পরীক্ষাগারের ছাড়পত্র ও কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের কাগজপত্র পরীক্ষা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সপ্তাহে ৮০ লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগ
মো. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কাস্টমস কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৮০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও করেছেন সোহেল রানা। তবে আবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এ দাবির পক্ষে নির্দিষ্ট ব্যাংক রেকর্ড, রসিদ বা স্বাধীন তদন্তের প্রমাণ রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে আমিনুল ইসলাম ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের লেনদেন, নগদ অর্থের গতিবিধি, সম্পত্তি কেনাবেচা ও আয়কর নথি পরীক্ষা করার দাবি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি, ব্যবসায়িক বিনিয়োগসহ অন্যান্য সম্পদের তথ্য যাচাইয়ের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠান ও ‘ক্লোজেট ক্লাউড’ ঘিরেও অভিযোগ
অভিযোগে ‘গুনগুন এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠানের কাস্টমস সরকার মো. আবু হানিফ এবং হানিফ/শরীফ নামে পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে আমিনুল ইসলামের কথিত যোগাযোগ ও যোগসাজশের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ যোগাযোগের ধরন বা আর্থিক লেনদেনের নির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে কি না, তা তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া ‘ক্লোজেট ক্লাউড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানি করে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগও করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা, বিল অব এন্ট্রি, ঘোষিত ও প্রকৃত পণ্যমূল্য, পরিশোধিত শুল্ক এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীদের তথ্য যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
সম্পদ ও অর্থপাচারের অভিযোগ
আবেদনে আমিনুল ইসলামের আয় ও সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি করা হয়েছে। তাঁর আয়কর রিটার্ন, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, জমি-ফ্ল্যাটের দলিল, গাড়ির মালিকানা, ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব ও বিনিয়োগের তথ্য যাচাইয়ের অনুরোধ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, কাস্টমস কার্যক্রম থেকে কথিতভাবে পাওয়া অবৈধ অর্থের একটি অংশ মার্কিন ডলারে রূপান্তর করে বিদেশে পাঠানো হয়ে থাকতে পারে। এ কারণে ব্যাংকিং লেনদেন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক অর্থ স্থানান্তরের নথি পরীক্ষা করার দাবি জানানো হয়েছে।
সোহেল রানা আরও দাবি করেছেন, আমিনুল ইসলাম এর আগে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ও ঢাকা উত্তর ভ্যাট কমিশনারেটসহ বিভিন্ন দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব কর্মস্থলে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা অনিয়মের নথি রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
আলামত সংরক্ষণের ওপর জোর
বিমানবন্দর কার্গোতে কথিত ৩০ কোটি টাকা মূল্যের পণ্য খালাসের অভিযোগের ক্ষেত্রে আলামত সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন অভিযোগকারী। তিনি সিসিটিভি ফুটেজ, ওয়্যারহাউস ইনভেন্টরি, কার্গো মুভমেন্ট, গেট পাস, ডেলিভারি রেকর্ড, এয়ারওয়ে বিল, বিল অব এন্ট্রি, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ডিউটি রোস্টার সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সংশ্লিষ্ট অভ্যন্তরীণ তদন্ত বা প্রশাসনিক নথি থাকলে সেগুলোও সংগ্রহ করে যাচাইয়ের অনুরোধ করা হয়েছে।
অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি
তবে লিখিত আবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। বিশেষ করে ৩০ কোটি টাকার পণ্য খালাস, প্রতি সপ্তাহে ৮০ লাখ টাকা ঘুষ, অর্থপাচার এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথিত যোগসাজশের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সরকারি নথি, সিসিটিভি ফুটেজ, আর্থিক লেনদেন ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে উপকমিশনার মো. আমিনুল ইসলামের বক্তব্য জানা গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে। একইভাবে অভিযোগে উল্লিখিত সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠান, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ‘ক্লোজেট ক্লাউড’-এর বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ।
সোহেল রানা অভিযোগগুলোর স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তদন্ত দাবি করেছেন। তাঁর মতে, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এখন এনবিআর, অর্থ মন্ত্রণালয় ও দুদক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কী ধরনের অনুসন্ধান করে এবং বিমানবন্দর কার্গোর নথি ও আর্থিক লেনদেন যাচাই করে কী তথ্য পাওয়া যায়—সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।
এসব অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য নিয়ে থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে……
