মায়ের চিকিৎসা করাতে এসে হাসপাতালের আটতলা থেকে পড়ে প্রাণ গেল ১৫ বছরের সামিয়ার। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। ফাইল ছবি
রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আটতলা থেকে পড়ে সামিয়া নুর (১৫) নামে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। শনিবার বিকেল ৩টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন বাবা নুরুন্নবী। মেয়েকে হারানোর বেদনায় বুক চাপড়ে তিনি বলছেন, আজ আমি সব হারালাম, এখন আমরা কী নিয়ে বাঁচব?’ মায়ের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এসে এমন মর্মান্তিক পরিণতি নেমে আসবে, তা কল্পনাও করতে পারেনি পরিবারটি।
সামিয়া গাজীপুরের কামারজুরী ইউসুফ আলী হাই স্কুল অ্যান্ড গার্লস কলেজের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পরিবারের সঙ্গে সে গাজীপুরের বোর্ডবাজার সাইনবোর্ডসংলগ্ন কলমেশ্বর এলাকায় বসবাস করত। তার বাবা নুরুন্নবী স্থানীয় বাজারে একটি কনফেকশনারির দোকান পরিচালনা করেন।
হাসপাতাল ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, সামিয়ার মা পারুল আক্তার (৪৫) জরায়ুর টিউমারের চিকিৎসার জন্য পাঁচ থেকে ছয় দিন আগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আটতলার একটি ওয়ার্ডে ভর্তি হন। আগামী ২৮ অক্টোবর তার অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা ছিল। মায়ের চিকিৎসাকে কেন্দ্র করে পরিবারের সদস্যরা তখন হাসপাতালেই অবস্থান করছিলেন।
মায়ের কাছে ভাত খেতে চেয়েছিল সামিয়া
ঘটনার বিবরণ দিয়ে সামিয়ার বাবা নুরুন্নবী জানান, হাসপাতালের বাইরে থেকে এসে সামিয়া তার মাকে বলে, ‘মা, ক্ষুধা লেগেছে, ভাত দাও। পরে ভাত খেয়ে বেড থেকে সামান্য দূরে কোমরসমান উঁচু একটি জানালার মতো জায়গায় গিয়ে বসে সে।
ওই সময় তার মা বেডের নিচে বসে ভাত খাচ্ছিলেন। জানালার মতো জায়গাটিতে বসে নিচের দিকে তাকানোর পর হঠাৎ মাথা চক্কর দিলে অসাবধানতাবশত নিচে পড়ে যায় সামিয়া। মুহূর্তের মধ্যেই আনন্দময় পারিবারিক সময় নেমে আসে গভীর শোকে।
নুরুন্নবী আরও বলেন, চিকিৎসকদের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন, নিচে পড়ে সামিয়ার ঘাড় ও একটি হাত ভেঙে যায়। তার কান দিয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। এ ছাড়া শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর আঘাতের কারণে রক্তক্ষরণ হয়। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি।
‘মাত্র তিন বছর বয়সে মেয়েটিকে দত্তক নিয়েছিলাম’
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে দিশেহারা বাবা নুরুন্নবী। শোকাতুর কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি নিঃসন্তান ছিলাম। মাত্র তিন বছর বয়সে কলিজার টুকরা মেয়েটিকে দত্তক নিয়েছিলাম। কত আদর করে তাকে মানুষ করেছি! আজ আমি সব হারালাম, এখন আমরা কী নিয়ে বাঁচব?’
যে সন্তানকে বুকের ভালোবাসায় বড় করেছেন, সেই মেয়ের এমন আকস্মিক মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন তিনি। মায়ের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে অবস্থান করা পরিবারটির কাছে এখন সামিয়ার স্মৃতিই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় সম্বল।
ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ মর্গে
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (পরিদর্শক) মো. হাবিবুর রহমান জানান, চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ওই কিশোরীর মৃত্যু হয়।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে সামিয়ার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানাকে অবগত করা হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
