সোমবার, ২৬শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

লাইসেন্স বাণিজ্য থেকে রেশন দুর্নীতি: চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসে এডি তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
অক্টোবর ২৫, ২০২৬ ১১:২৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ফায়ার লাইসেন্স নবায়ন, বদলি-পোস্টিং, টেন্ডার ও রেশন সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ; তদন্ত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। ফাইল ছবি

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক (এডি) মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, লাইসেন্স বাণিজ্য, বদলি-পোস্টিংয়ে আর্থিক লেনদেন, সরকারি মালামাল বিক্রি, রেশন সরবরাহ এবং বিল পরিশোধে কমিশন দাবিসহ ১৩টি সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। এসব অভিযোগ নিয়ে ইতিপূর্বে একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলেও তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে বারবার অভিযোগ ওঠার পরও তিনি জবাবদিহির আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের নবাগত মহাপরিচালকের জরুরি হস্তক্ষেপ এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ।

লাইসেন্স নবায়ন থেকে সরকারি মালামাল বিক্রি—বিভিন্ন অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে প্রভাব বিস্তার, ফায়ার লাইসেন্সের পুনর্মূল্যায়ন (রি-অ্যাসেসমেন্ট) ও নবায়ন অনুমোদনের ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূতভাবে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে নগদ অর্থ গ্রহণ এবং সরকারি মালামাল বিক্রিতে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগে যোগদানের পর ফায়ার সার্ভিসের নষ্ট ও অকেজো সরকারি মালামাল প্রচলিত সরকারি বিধি ও নীতিমালা অনুসারে নিলামে বিক্রি না করে খোলাবাজারে গোপনে বিক্রি করা হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা যাচাই করা প্রয়োজন।

পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ, ভাইকে অতিরিক্ত দায়িত্ব

ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও উঠেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, নিজের ছোট ভাই শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে ফায়ার সার্ভিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের ইন্সপেক্টরদের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে বিভাগের ইন্সপেক্টরদের ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এর আগে সিলেটে দায়িত্ব পালনকালে ২০২৬ সালের মে ও জুন মাসে ইন্সপেক্টরদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় অগ্নিনিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই না করেই তাড়াহুড়ো করে মোট ৪৫২টি ফায়ার সেফটি লাইসেন্স ইস্যু করা হয়। এসব লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিরাপত্তা যাচাই ও অনুমোদনপ্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

বদলি-পোস্টিংয়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ

তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বদলি ও পদায়নকেন্দ্রিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, চট্টগ্রাম বিভাগে কাঙ্ক্ষিত পদায়ন পেতে তিনি তৎকালীন মহাপরিচালকের স্টাফ অফিসার ও উপপরিচালক আরমানকে মোটা অঙ্কের উৎকোচ দিয়েছিলেন।

একইভাবে, সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলির সুপারিশ পেতেও নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দিতে হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অর্থ না দিলে সংশ্লিষ্ট ফাইল আটকে রাখা হয় এবং বদলির সুপারিশ করা হয় না। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে বদলিসংক্রান্ত নথি, আর্থিক লেনদেনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।

রেশন সরবরাহে নিম্নমানের ডাল, প্রতিবাদ করলেই বদলির ভয়

চট্টগ্রাম বিভাগের ই-জিপি টেন্ডারের মাধ্যমে রেশনের জন্য সরবরাহ করা ডালের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ইউডি হাশেমের মাধ্যমে চাকতাই থেকে নিম্নমানের ডাল কিনে শহরের বাইরের বিভিন্ন ফায়ার স্টেশনে সরবরাহ করা হয়।

এ নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ প্রতিবাদ জানালে তাঁদের বদলির ভয় দেখিয়ে চুপ রাখার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকরা তাঁর বক্তব্য জানতে চাইলে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমঝোতার চেষ্টা করা হয় এবং পরে স্টাফদের প্রতি কেজি ডালের বিপরীতে ৪০ টাকা করে পরিশোধ করা হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

রেশন সরবরাহের মান, ক্রয়প্রক্রিয়া, দরপত্রের শর্ত এবং অর্থ পরিশোধের নথি পর্যালোচনা করলে এ অভিযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।

বকেয়া বিল ফেলে রেখে নতুন বিল, ১৫ শতাংশ কমিশন দাবির অভিযোগ

২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বিভাগের ১০৫টি ফায়ার স্টেশনের বিভিন্ন গাড়ি ও পাম্পের মেরামতসংক্রান্ত বিল পরিশোধ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, বিভাগীয় কারিগরি কারখানায় মেরামতের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পরও আগের বকেয়া বিল পরিশোধ না করে নিজের পছন্দমতো নতুন বিল পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়। এ সময় বাবুলসহ তিনটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে অগ্রিম ১৫ শতাংশ কমিশন দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই অর্থ ঢাকায় অধিদপ্তরে পৌঁছে দিতে হবে—এমন কথাও বলা হয়েছিল বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। কমিশন না দিলে বিল পরিশোধ করা হবে না বলেও জানানো হয়েছিল বলে তাঁদের অভিযোগ।

সরকারি অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে বিলের ক্রম, অনুমোদন, কাজের পরিমাণ, অর্থ পরিশোধের নথি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।

ইনানী টুপ টুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: লাইসেন্স নিয়ে ঘুষ দাবির অভিযোগ

তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হলো অগ্নিনিরাপত্তা-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগ। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভের ইনানী টুপ টুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের আগে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধি রহিম ও কামাল ফায়ার লাইসেন্স এবং অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ে পরামর্শ নিতে এডি তৌফিকুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করেন।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি ওই প্রতিষ্ঠানে বসে খাওয়া-দাওয়া করেন এবং পরবর্তী যোগাযোগের জন্য তাঁর রানারের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। পরে তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী রানার লাইসেন্সের জন্য ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগকারীদের ভাষ্য। এ ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটি লাইসেন্স নেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে বলে দাবি করা হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে ওই রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে লাইসেন্স না নেওয়া, অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি এবং অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির মধ্যে সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তসাপেক্ষ। এ ক্ষেত্রে অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন, ভবন ও অগ্নিনিরাপত্তা-সংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কুমিল্লায় কর্মকালেও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রীর অভিযোগ

এর আগে কুমিল্লায় কর্মরত থাকাকালে মনোহরগঞ্জ নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণকাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী সরবরাহের অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর এপিএস কামালের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে তিনি প্রভাব খাটিয়ে এ ধরনের অনিয়মের সুযোগ নেন।

এ ছাড়া কুমিল্লা ফায়ার স্টেশনের মসজিদ নির্মাণের সময় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নগদ অর্থ, রড, সিমেন্ট, বালু, ফ্যান ও টাইলস সংগ্রহ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব নির্মাণসামগ্রী ও নগদ অর্থের একটি বড় অংশ নিজের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।

তবে নির্মাণকাজের মান, অনুদানের হিসাব, মালামাল গ্রহণ ও ব্যবহারের নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই ছাড়া এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

বক্তব্য পাওয়া যায়নি, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

এডি মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে সাংবাদিকরা একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁকে খুদেবার্তা বা এসএমএস পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে।

এ অবস্থায় চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

তাঁদের প্রত্যাশা, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের নবাগত মহাপরিচালক বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন, বদলি-পোস্টিং, রেশন ক্রয়, টেন্ডার, মেরামত বিল এবং সরকারি মালামাল বিক্রির প্রতিটি অভিযোগ খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেবেন। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা জনসমক্ষে তুলে ধরার দাবি জানানো হয়েছে।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ