আলীনা ইসলাম আয়াত
চার বছর ১১ মাস বয়সী নিষ্পাপ শিশু আলীনা ইসলাম আয়াত। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে তার নিখোঁজ হওয়ার খবর নাড়িয়ে দিয়েছিল পুরো চট্টগ্রামকে। কয়েকদিনের অনুসন্ধান শেষে সামনে আসে এক ভয়াবহ সত্য—অপহরণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে শিশুটিকে। এরপর লাশ ছয় টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়া হয়।
সেই আলোচিত ও লোমহর্ষক ঘটনার প্রায় সাড়ে তিন বছর পর, আরেকটি বিশ্বকাপের আবহে আজ বুধবার মামলার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। রায়ে প্রধান আসামি আবির আলীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
চট্টগ্রামের ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মুহাম্মদ আলী আক্কাস এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আবির আলীকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আরও পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অনাদায়ে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশও দেওয়া হয়।
দণ্ডিত আবির আলীর বাড়ি রংপুর জেলায়। ঘটনার সময় তিনি চট্টগ্রাম নগরীর ইপিজেড থানার দক্ষিণ হালিশহরের নয়ারহাট এলাকায় পরিবারের সঙ্গে ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।
যেভাবে নিখোঁজ হয়েছিল আয়াত
২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর বিকেলে দক্ষিণ হালিশহরের নয়ারহাট এলাকা থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয় শিশু আয়াত। তার বাবা সোহেল রানা মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে ইপিজেড থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
নিখোঁজের ঘটনায় থানা পুলিশের পাশাপাশি তদন্তে নামে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তের একপর্যায়ে সন্দেহের তীর যায় প্রতিবেশী আবির আলীর দিকে।
মুক্তিপণের পরিকল্পনা, তারপর নির্মম হত্যা
পিবিআইয়ের অভিযোগপত্র অনুযায়ী, আয়াতের দাদা মনজুর হোসেনের মালিকানাধীন ভবনেই ভাড়া থাকত আবিরের পরিবার। আর্থিক সংকট ও হতাশা থেকে আয়াতকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। কিন্তু পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে গেলে শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
পরে এক কিশোর সহযোগীর সহায়তায় লাশ ছয় টুকরো করা হয়। এর মধ্যে তিন টুকরো নগরীর আউটার রিং রোডসংলগ্ন বে-টার্মিনাল এলাকায় সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। বাকি তিন টুকরো আকমল আলী রোডের শেষপ্রান্তে একটি নালার স্লুইচগেট এলাকায় ফেলে রাখা হয়।
গ্রেপ্তার, স্বীকারোক্তি ও লাশ উদ্ধারের ঘটনা
২০২২ সালের ২৪ নভেম্বর পিবিআই আবির আলীকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন ২৫ নভেম্বর আদালতে তিনি দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।
তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৩০ নভেম্বর আকমল আলী রোডের শেষপ্রান্তের স্লুইচগেট এলাকা থেকে আয়াতের বিচ্ছিন্ন দুই পায়ের অংশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন উদ্ধার করা হয় শিশুটির খণ্ডিত মাথা। পরে ৬ ডিসেম্বর আবিরের সহযোগী এক কিশোরকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
দীর্ঘ বিচার শেষে রায়
পিবিআই ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। ২০২৪ সালের ৩০ মে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।
মামলায় মোট ৫০ জন সাক্ষীর মধ্যে ৩৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন আদালত। দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আদালত আজ বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।
আদালতে উপস্থিত থাকা পিবিআই পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী জানান, মামলার দুই আসামির মধ্যে আবির আলীর বিচার সম্পন্ন হয়েছে। অপর আসামি ঘটনার সময় কিশোর হওয়ায় তার বিচার শিশু আদালতে চলমান রয়েছে।
এক সময় পুরো দেশকে নাড়িয়ে দেওয়া আয়াত হত্যা মামলার এই রায়কে স্বস্তির নিঃশ্বাস হিসেবে দেখছেন অনেকেই। তবে হারিয়ে যাওয়া একটি শিশুর জীবন আর কোনো রায়ই ফিরিয়ে দিতে পারবে না, এটাই এই ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্য।
