শনিবার, ৭ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

এনবিআরে ‘সর্বেসর্বা’ কর কমিশনার মুরাদ! ক্ষমতার প্রভাব, বদলি-বাণিজ্য ও বিপুল সম্পদের অনুসন্ধানে নতুন প্রশ্ন

স্টাফ রিপোর্টার
নভেম্বর ৫, ২০২৬ ১১:৩৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার অনিয়ম, দুর্নীতি এবং করদাতাদের সঙ্গে গোপন আঁতাতের কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রাষ্ট্র। প্রশাসনিক দুর্বলতা, কর ফাঁকির সুযোগ এবং অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সরকারের রাজস্ব আদায়ের বড় একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিভিন্ন বিশ্লেষণ ও অর্থনৈতিক সমীক্ষায়ও কর ফাঁকি এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ উঠে এসেছে। বিশেষ করে করপোরেট ও আয়কর খাতে অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজস্ব প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কিছু কর্মকর্তার কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ঢাকা কর অঞ্চল-৩-এর অতিরিক্ত কর কমিশনার মো. মুরাদ আহমেদ। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক তদবিরে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাওয়া, করদাতাদের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলা, ঘুষ-দুর্নীতি এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং তার সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজনৈতিক প্রভাবেই কি বারবার গুরুত্বপূর্ণ পদে?

চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর মরহুম মমতাজ উদ্দিনের ছেলে মো. মুরাদ আহমেদ ২০০৫ সালে ২৪তম বিসিএস (কর) ক্যাডার হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। অভিযোগ রয়েছে, বিগত রাজনৈতিক সরকারের আমলে প্রভাবশালী মহল ও বিভিন্ন মন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের সুবাদে তিনি ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় কর্মস্থলে দায়িত্ব পেয়েছেন। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।

তার দীর্ঘ কর্মজীবনের বিভিন্ন কর্মস্থলের নথিপত্র, বদলির আদেশ এবং করদাতাদের সঙ্গে সম্পাদিত বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যালোচনা করা হলে অনিয়মের আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যুগ্ম কর কমিশনার হিসেবে পরিদর্শী রেঞ্জ-৪, কর অঞ্চল-১৪ এবং পরবর্তী সময়ে কর অঞ্চল-১৫-এ দায়িত্ব পালনকালে করদাতাদের হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালে তাকে পরিদর্শী রেঞ্জ-৩, কর অঞ্চল-৪-এ বদলি করা হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই বদলি কার্যত শাস্তিমূলক ছিল না। কারণ, গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব থেকে তাকে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থানান্তর করা হয়েছিল মাত্র।

অন্যদিকে, বিগত সরকারের সময়ে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের অনেক কর্মকর্তাকে শাস্তিমূলকভাবে ঢাকার বাইরে বদলি করা হলেও মুরাদ আহমেদ তার কর্মজীবনের প্রায় পুরো সময়ই রাজধানীকেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে তার রাজনৈতিক যোগাযোগ ও প্রশাসনিক প্রভাব কতটা কার্যকর ছিল, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

এর মধ্যে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডের ৩/২১ নম্বর ভবনের সপ্তম তলার ‘এ’ ব্লকের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়ে বিশেষভাবে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ফ্ল্যাটটির প্রকৃত মালিক মুরাদ আহমেদ। যার বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই ভবনের ফ্ল্যাট মালিকদের তালিকায় তার নাম রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রায় কোটি টাকা মূল্যের একটি ব্যক্তিগত গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৮-৪০১১) নিজের নামে নিবন্ধন না করে ছোট ভাই মুনতাসির আহমেদের নামে নিবন্ধন করিয়ে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরবর্তী সময়ে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

রাজস্ব প্রশাসনের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ ওঠা শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির প্রশ্ন নয়, এটি দেশের কর ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আদায় এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার প্রভাব পড়তে পারে সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং সাধারণ করদাতাদের মধ্যে কর প্রশাসনের প্রতি আস্থার ওপর।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মুরাদ আহমেদের পূর্ববর্তী কর্মস্থলগুলোর নথিপত্র, করদাতাদের সঙ্গে সম্পাদিত কার্যক্রম, বদলির প্রক্রিয়া এবং সম্পদের বিবরণ নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা হলে আরও অনেক তথ্য সামনে আসতে পারে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে টানা দুই সপ্তাহে একাধিকবার মুরাদ আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদক জানিয়েছেন। একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। সরাসরি সাক্ষাতের অনুরোধ জানানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।

ফলে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তার নিজস্ব বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।

রাজস্ব প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে কোনো কর্মকর্তা যদি ক্ষমতার অপব্যবহার, করদাতাদের সঙ্গে অনৈতিক যোগসাজশ কিংবা অবৈধ সম্পদ অর্জনের সঙ্গে জড়িত থাকেন, তাহলে তা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। তাই অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই, সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
বিশেষ খবর সর্বশেষ