শ্রমিক আন্দোলনে অর্থায়ন কিংবা আন্দোলনে সম্পৃক্ততার সন্দেহে ২০৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এর মধ্যে ব্যক্তিপর্যায়ে ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক কার্যক্রম যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিবেচনায় ব্যাংক লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য তলব করা হয়েছে। গত বুধ ও বৃহস্পতিবার দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে।
এনবিআরের একাধিক সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি কিংবা শ্রমিক আন্দোলনে অর্থায়নের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে চায় সরকার। সরকারের একাধিক সংস্থার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ অনুসন্ধানমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে তালিকাভুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ওঠা সন্দেহের বিষয়টি এখনো তদন্তসাপেক্ষ।
সূত্র জানায়, প্রথম দফায় গত বুধবার ২০ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে নতুন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যুক্ত করে বৃহস্পতিবার মোট ২০৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং লেনদেনের তথ্য তলবের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে ১২৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট এবং ৮০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে সেন্ট্রাল ইনভেস্টিগেশন সেল (সিআইসি) পদক্ষেপ নিয়েছে।
তালিকা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, হিসাব জব্দ ও তথ্য তলবের আওতায় আসা বেশির ভাগ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তালিকায় সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের নামও রয়েছে। পাশাপাশি দেশের তৈরি পোশাক ও শিল্প খাতের পরিচিত কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ এবং সেসব প্রতিষ্ঠানের মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
বড় শিল্পগোষ্ঠীর একাধিক প্রতিষ্ঠানের নাম
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, তালিকায় মণ্ডল গ্রুপ, স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ, নিপা গ্রুপ, ওয়েল গ্রুপ, টুসুকা গ্রুপ ও এনভয় গ্রুপসহ বেশ কয়েকটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি মালিক, পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবের তথ্যও চাওয়া হয়েছে।
আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটের তালিকায় মণ্ডল গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—মণ্ডল ইনটিমেটস, কটন ফিল্ড, কটন ক্লাব, কটন ক্লথিং, মণ্ডল ফেব্রিক্স, ট্রপিক্যাল নিটেক্স, মার্ক সোয়েটার, মন ট্রিমস, মণ্ডল স্পিনিং মিলস, মণ্ডল ফার্মিং অ্যান্ড ফুড প্রসেসিং লিমিটেড, আলিম নিট, মণ্ডল সিকিউরিটিজ, অ্যাপোলো ফ্যাশন, ট্রিমস ইন্টারন্যাশনাল, ইকো ইনটিমেটস, নূর চেকস অ্যান্ড স্ট্রাইপস, অ্যাপোলো নিটওয়্যার, অ্যাপোলো প্যাকেজিং, কটন ক্লাউট, নিটেক্স ড্রেসেস, এমব্রেলা, মণ্ডল অ্যান্ড কোম্পানি, মণ্ডল নিট কম্পোজিট, মণ্ডল নিটওয়্যারস, মণ্ডল ইয়ার্ন ডাইং এবং মন্টেক্স ফেব্রিক্স।
এ গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে আবদুল আলীম মণ্ডল, জুবায়ের মণ্ডল, হাজি আবদুল মান্নান মণ্ডল, আবদুল মোমিন মণ্ডল, মাহমুদুল হাসান, আসাদুর রহমান সিকদার, গোলাম ফারুক তালুকদার, মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন, খন্দকার ফারুক কায়সার, নাহিদ খন্দকার ও হাজি আবদুল মজিদ মণ্ডলের নাম রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আট নারী সদস্যের নামও তালিকাভুক্ত হয়েছে।
পানামা এগ্রো কমপ্লেক্স, জিগজ্যাগ স্টুডিও এবং গিভেন্সি গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেনের তথ্যও তলব করা হয়েছে। গিভেন্সি গ্রুপের আওতাধীন গিভেন্সি গার্মেন্ট, জিভেন্সি স্পিনিং মিলস, গিভেন্সি গার্মেন্ট অ্যাক্সেসরিজ, গিভেন্সি ইয়ার্ন ডাইং এবং গিভেন্সি ফুডস অ্যান্ড এসেনশিয়ালস রয়েছে এ তালিকায়। গ্রুপটির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে খাতিব আবদুল জাহিদ মুকুল, খাতিব আবদুল হাদী এবং দুই নারী পরিচালকের নাম রয়েছে।
স্ট্যান্ডার্ড ও নিপা গ্রুপও নজরদারিতে
স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ এবং দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স-সাগর ইনফো বিল্ডার্সের নামও রয়েছে ব্যাংক হিসাব জব্দ ও তথ্য তলবের তালিকায়। এ গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ার আতিকুর রহমান, ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম মোশাররফ হোসেন, হাসনাত মোশাররফ, ফাহিম মোশাররফ ও হাসিব মোশাররফের নাম রয়েছে। পাশাপাশি তিন নারী সদস্যের ব্যাংক হিসাবের তথ্যও চাওয়া হয়েছে।
নিপা গ্রুপের নিপা নিটওয়্যার কোম্পানি, সেলিনা অ্যাপারেলস এবং নিপা ফ্যাশন ওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া গ্রুপটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সঞ্জিদ চৌধুরী, খসরু চৌধুরী, এম মুনিরুল ইসলাম ও টিপু সুলতানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব করা হয়েছে।
ওয়েল ও টুসুকা গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানের তথ্য চাওয়া
ওয়েল গ্রুপের ওয়েল অ্যাক্সেসরিজ, ওয়েল ফ্যাশন এবং ওয়েল ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানির ব্যাংক লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়েছে। গ্রুপটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আব্দুস ছালাম, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সৈয়দ শহিদুল ইসলাম ও সৈয়দ তারিকুল ইসলামের নাম রয়েছে তালিকায়। এ ছাড়া কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত আরও সাত নারী সদস্যের নামও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে, টুসুকা গ্রুপের টুসুকা প্যাকেজিং, টুসুকা স্টিচেস, টুসুকা অ্যাপারেলস, টুসুকা ফ্যাশনস, টুসুকা ওয়াশিং, টুসুকা প্রসেসিং, টুসুকা ডেনিম, টুসুকা জিন্স ও টুসুকা ট্রাউজার্সের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব করা হয়েছে।
এ গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে ফিরোজ আলম, রাফায়েত উল্লাহ খান, শফিকুল ইসলাম, ইকবাল কবির, ফয়জুর রহমান, আরশাদ জামাল, একরামুল হক, মো. আতিকুজ্জামান (সাগর) ও আতিকুজ্জামান (রিপন)-এর নাম রয়েছে। এ ছাড়া টুসুকা ফ্যাশনসের হিসাবও নির্দেশনার আওতায় এসেছে। তালিকায় এস এম আবদুল মান্নান, ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাসহ আরও দুজনের নাম রয়েছে।
এনভয় গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ও পরিবারের সদস্যদের নাম
এনভয় গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের তথ্যও চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এনভয় গার্মেন্ট, এনভয় প্যাকেজেস, এনভয় ডিজাইন, এনভয় ফ্যাশনস এবং এনভয় টেকনোলজি। এ ছাড়া এনভয় গ্রুপের আব্দুস সালাম মুর্শেদী ও তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যের নামও তালিকায় রয়েছে।
তদন্তের লক্ষ্য অর্থের উৎস ও ব্যবহারের ধরন অনুসন্ধান
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শ্রমিক আন্দোলনে অর্থায়ন, অর্থের উৎস এবং অর্থের সম্ভাব্য ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের অংশ হিসেবেই ব্যাংক হিসাব জব্দ ও লেনদেনের তথ্য তলবের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তালিকাভুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে শ্রমিক অসন্তোষের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে চায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
তবে ব্যাংক হিসাব জব্দ বা লেনদেনের তথ্য তলবের অর্থ এই নয় যে তালিকাভুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান শ্রমিক আন্দোলনে অর্থায়নের সঙ্গে জড়িত—এমনটি প্রমাণিত হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা, অর্থের উৎস ও ব্যবহারের ধরন নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
