লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার নয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষ, প্রধান শিক্ষকের কক্ষ ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণ প্রকল্পকে ঘিরে একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি প্রাক্কলন উপেক্ষা করে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, নির্মাণকাজের গুণগত মানে আপস এবং কাজ শেষ হওয়ার আগেই চূড়ান্ত বিল পরিশোধের মতো গুরুতর অনিয়ম ঘটেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী আবদুল কাদের মোজাহিদ।
অভিযোগকারীদের দাবি, ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে সরকারি অর্থ অপচয় এবং অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। যদিও উপজেলা প্রকৌশলী অভিযোগের বিষয়ে কিছু অনিয়মের বিষয় পাওয়া গেছে বলে স্বীকার করলেও বিস্তারিত মন্তব্য পরে করবেন বলে জানিয়েছেন।
বিশ্বব্যাংকের ২ কোটি ৪৮ লাখ টাকার প্রকল্প ঘিরে প্রশ্ন
এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রকল্পের আওতায় কমলনগর উপজেলার নয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য মোট ২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষ, প্রধান শিক্ষকের কক্ষ এবং একটি বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসব কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায়।
সরকারি প্রাক্কলনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল, ভবনের কলাম, টাইবিম, লিন্টেল ও ছাদের ঢালাইয়ের সময় আধুনিক স্টিল সাটারিং ব্যবহার করতে হবে। নির্মাণকাজের মান নিশ্চিত করতে নির্ধারিত মানের ১৬ বিডব্লিউজি এমএস শিট এবং নির্দিষ্ট মাপের অ্যাঙ্গেল ব্যবহারের নির্দেশনাও ছিল। প্রতিটি বিদ্যালয়ের জন্য শুধু স্টিল সাটারিং বাবদ সাড়ে তিন লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় ধরা হয়েছিল।
স্টিলের বদলে বাঁশ-কাঠ ব্যবহারের অভিযোগ
কিন্তু সরেজমিনে কাজ দেখেছেন এমন একাধিক ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বাস্তবে স্টিল সাটারিংয়ের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে পুরোনো বাঁশ, কাঠ ও জরাজীর্ণ উপকরণ।
তাদের দাবি, এভাবে কাজ করায় নির্মাণের গুণগত মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, স্টিল সাটারিংয়ের জন্য বরাদ্দ অর্থ ব্যয় না করেই বিল পরিশোধের সময় কাগজে-কলমে স্টিল ব্যবহারের তথ্য দেখানো হয়েছে। তাদের হিসাবে, শুধু এই একটি খাত থেকেই নয়টি প্রকল্পে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২৫ শতাংশ কাজ, অথচ চূড়ান্ত বিল পরিশোধ
প্রকল্পের কাজের অগ্রগতিও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকল্পের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। অথচ এরই মধ্যে চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, কাজ অসম্পূর্ণ থাকা অবস্থায় কীভাবে বিল চূড়ান্ত করা হলো এবং কোন ভিত্তিতে সন্তোষজনক অগ্রগতির প্রত্যয়ন দেওয়া হয়েছে? যেসব বিদ্যালয়ে চলছে নির্মাণকাজ
অভিযোগ ওঠা প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে—
চরজাঙ্গালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
চরজাঙ্গালিয়া খাসেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
মতিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
হাজিরহাট মিল্লাত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
দক্ষিণ-পূর্ব চরকাদিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
চরকাদিরা কে এম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
উত্তর-পশ্চিম চরমার্টিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
পূর্ব চরফলকন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
একটি বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ প্রকল্প
প্রধান শিক্ষক ও এসএমসির উদ্বেগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই প্রধান শিক্ষক জানান, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ হলেও বাস্তবে নির্মাণকাজের গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর যথাযথ তদারকিরও ঘাটতি রয়েছে।
তারা বলেন, কাজ এখনো অসম্পূর্ণ থাকা সত্ত্বেও চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে, যা তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে।
বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির (এসএমসি) কয়েকজন সদস্যও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাদের মতে, প্রকল্পের শুরু থেকেই নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারে অনিয়ম লক্ষ্য করা গেছে। বিষয়টি স্থানীয়ভাবে একাধিকবার জানানো হলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের আশঙ্কা, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের ফলে ভবিষ্যতে ভবনের স্থায়িত্ব ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
স্থানীয়দের দাবি—স্বাধীন তদন্ত হোক
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে নির্ধারিত মানের উপকরণ ব্যবহার করা হলে বিদ্যালয়গুলো দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হতো। কিন্তু যদি সত্যিই স্টিলের পরিবর্তে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে সাটারিং করা হয়ে থাকে, তাহলে এটি শুধু প্রাক্কলনের লঙ্ঘনই নয়, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
তাদের দাবি, বিষয়টি স্বাধীনভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ঠিকাদারের দাবি—প্রাক্কলন মেনেই কাজ
অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গোফরান ট্রেডার্স ও ফয়সাল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. গোফরান বলেন, তারা প্রাক্কলন অনুযায়ীই কাজ করছেন এবং উপজেলা প্রকৌশলীর নির্দেশনা মেনেই সব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তার দাবি, কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম করা হয়নি।
প্রকৌশলী মোজাহিদের বক্তব্য
উপজেলা প্রকৌশলী আবদুল কাদের মোজাহিদ অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার না করে বলেন, কিছু অনিয়ম পাওয়া গেছে এবং ঠিকাদারকে সে বিষয়ে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে পরে বিস্তারিত আলোচনা করবেন।
তবে কী ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেছে, কাজ শেষ হওয়ার আগে বিল পরিশোধ করা হয়েছে কি না কিংবা স্টিলের পরিবর্তে অন্য উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
জেলা ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া
এলজিইডির লক্ষ্মীপুর জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরী বলেন, অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। তিনি জানান, অভিযোগ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য এসেছে এলজিইডির নোয়াখালী অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. মহসিনের কাছ থেকে। তিনি বলেন, উপজেলা প্রকৌশলী আবদুল কাদের মোজাহিদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে একাধিক অভিযোগের তদন্ত চলছে।
তার ভাষায়, এ ভদ্রলোকের কারণে আমাদের এলজিইডি সেক্টরের দুর্নাম হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, নতুন এ অভিযোগও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
সরকারি অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে প্রকৌশলীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পের নকশা, প্রাক্কলন, উপকরণের মান, কাজের অগ্রগতি এবং বিল পরিশোধ—সব ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর তদারকির ওপর নির্ভর করে প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও গুণগত মান।
ফলে কোনো প্রকল্পে প্রাক্কলন বহির্ভূত কাজ, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার কিংবা অসম্পূর্ণ কাজের বিপরীতে বিল পরিশোধের অভিযোগ উঠলে তা শুধু একটি প্রকল্প নয়, পুরো বাস্তবায়ন ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোতে সাধারণত কঠোর আর্থিক ও কারিগরি মানদণ্ড অনুসরণ করার কথা। প্রতিটি ধাপে তদারকি, পরিমাপ এবং গুণগত মান যাচাইয়ের বিধান রয়েছে। তাই কমলনগরের এই প্রকল্পে ওঠা অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শুধু স্থানীয় প্রশাসনের জন্য নয়, অর্থায়নকারী সংস্থার জন্যও উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এদিকে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে। তদন্তে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি নিম্নমানের নির্মাণকাজ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। অন্যদিকে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সেটিও তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
কমলনগরের নয়টি বিদ্যালয়ের নির্মাণ প্রকল্প ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ এখন প্রশাসনিক তদন্তের অপেক্ষায়। তদন্তের ফলই নির্ধারণ করবে অভিযোগগুলো কতটা সত্য এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারে কোনো অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলা হয়েছে কি না। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগ অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হবে।
