কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় এক তরুণীকে চুরির অপবাদ দিয়ে তাঁর দুই ভাই-বোনসহ কয়েক ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, তরুণীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর, মাথার চুল কেটে দেওয়া এবং জুতার মালা পরিয়ে ‘মধ্যযুগীয় কায়দায়’ অপমান করারও অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ঘটনাটি ঘটেছে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের হাজী শরীয়তউল্লাহ কলেজসংলগ্ন এলাকায়। গত মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলা এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মুদি দোকানদার আবুল মোল্লার ছেলে মনির মোল্লা (২৫), তরুণী ফারিয়া আক্তার (১৮)-কে বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করে আসছিলেন এবং মাঝেমধ্যেই কুপ্রস্তাব দিতেন। এসব প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে মনির ও তাঁর সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে তরুণী এবং তাঁর ছোট ভাই-বোনকে নির্যাতন করেন বলে অভিযোগ পরিবারের।
দোকানে যাওয়ার পরই শুরু হয় বিপত্তি
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে ফারিয়া আক্তার তাঁর বোন মারিয়া আক্তার (১৩) ও ভাই ফাহিম (৭)-কে সঙ্গে নিয়ে মনির মোল্লার মুদি দোকানে কেনাকাটা করতে যান।
অভিযোগ রয়েছে, দোকানের সামনেই মনির তরুণীকে বিভিন্ন অশালীন কথাবার্তা ও রাতে দেখা করার প্রস্তাব দেন। এতে ফারিয়া প্রতিবাদ করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
একপর্যায়ে মনির তরুণীসহ তাঁর দুই ভাই-বোনকে দোকানের পাশে ফৌজিয়া সরদারের বাড়িতে নিয়ে একটি কক্ষে আটকে রাখেন বলে অভিযোগ। পরিবারের দাবি, সেখানে তাদের হাত-পা বেঁধে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়।
চিৎকার শুনে ছুটে আসে লোকজন, এরপর ‘চোর’ অপবাদ
ভুক্তভোগীদের চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে ঘটনাটি আরও ভয়াবহ রূপ নেয় বলে অভিযোগ।
পরিবারের দাবি, তখন ফারিয়া ও তাঁর দুই ভাই-বোনকে চুরির অপবাদ দেওয়া হয়। এরপর ফৌজিয়া সরদার (৪০), আফসানা বেগম (৫০), নিশি সরদার (২৫) এবং মনির মোল্লাসহ কয়েকজন তাদের গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করেন।
অভিযোগ রয়েছে, একপর্যায়ে ফারিয়ার মাথার চুল কেটে দেওয়া হয় এবং তাঁকে জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়। পুরো ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
দুপুর ১২টার দিকে খবর পেয়ে সখিপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ফারিয়া ও তাঁর দুই ভাই-বোনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।
নিরাপত্তাহীনতায় বাড়ি ছেড়েছে পুরো পরিবার
ঘটনার পর ভুক্তভোগী পরিবারটি নিজ বাড়িতে অবস্থান করতে পারছে না বলে জানিয়েছে। নিরাপত্তার কারণে তারা প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে ভুক্তভোগীদের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। পরে আত্মীয়ের বাড়িতে কথা হয় ফারিয়ার মা ফাতেমা বেগম (৪১)-এর সঙ্গে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মনির আমার মেয়েকে বিভিন্ন ধরনের কুপ্রস্তাব দিচ্ছে। মঙ্গলবার সকালে আমার দুই মেয়ে ও এক ছেলে বাজার করতে মনিরের দোকানে যায়। সেখানে আমার বড় মেয়েকে রাতে দেখা করার প্রস্তাব দেয়। মেয়ে প্রতিবাদ করলে তাকে ও আমার দুই সন্তানকে জোর করে ফৌজিয়ার বাড়িতে নিয়ে আটকে রাখা হয়। পরে চুরির অপবাদ দিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর ও চুল কেটে দেওয়া হয়।
ফাতেমা বেগম আরও বলেন, তাঁর সন্তানদের মারধরকারীরা এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আত্মীয় হওয়ায় তারা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।
ভুক্তভোগী তরুণীর অভিযোগ
ফারিয়া আক্তারের অভিযোগ, মনির তাঁকে প্রায়ই কুপ্রস্তাব দিতেন। তিনি তা এড়িয়ে যেতেন।
ফারিয়া বলেন, ঘটনার দিন সকালে দোকানে কেনাকাটা করতে গেলে মনির আমাকে রাতে দেখা করার প্রস্তাব দেয়। আমি প্রতিবাদ করলে আমাকে ও আমার ভাই-বোনকে জোর করে পাশের বাড়িতে নিয়ে যায়। আমাকে অন্য একটি কক্ষে নিয়ে জামাকাপড় খুলে শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্পর্শ করে। আমি চিৎকার করলে লোকজন আসার পর মনির বলে আমি নাকি চুরি করেছি। এরপর আমাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করে এবং চুল কেটে দেয়।
তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানান।
‘অভিযোগ তুলে না নিলে লাশ পড়ে থাকবে’—পরিবারের দাবি
ভুক্তভোগীর বাবা ফারুক বেপারী (৫০) অভিযোগ করেন, ঘটনার পর থেকেই তারা হুমকির মধ্যে রয়েছেন।
তিনি বলেন, যেভাবে আমার সন্তানদের মারধর করা হয়েছে, এটা কোনো বাবা সহ্য করতে পারবে না। আমার সন্তানদের মেরে ফেলতে চেয়েছিল। এখন উল্টো আমরাই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। অভিযোগ তুলে নিতে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ না তুললে যেখানে-সেখানে লাশ পড়ে থাকবে—এমন হুমকিও দেওয়া হয়েছে। আমরা গরিব মানুষ, কী করব?
প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যেও উঠে এসেছে নির্যাতনের অভিযোগ
ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন এমন এক নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চিৎকার শুনে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি তরুণীকে গাছের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পান।
তাঁর ভাষ্য, তরুণীর জামাকাপড় ছেঁড়া ছিল এবং মাথার চুল কেটে দেওয়া হচ্ছিল। অন্য দুই ভাই-বোনকেও রশি দিয়ে পাশের ঘরে বেঁধে রাখা হয়েছিল।
ওই নারী বলেন, মনির তাদের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ করলেও কী চুরি হয়েছে, তা স্পষ্ট করে বলতে পারেননি। তাঁর দাবি, তরুণীকে এর আগেও মনির একাধিকবার উত্ত্যক্ত ও কুপ্রস্তাব দিয়েছেন বলে স্থানীয়রা দেখেছেন।
অভিযুক্ত মনিরের দাবি—‘চুরি করেছে, আমি মারধরে জড়িত নই’
তবে অভিযুক্ত মনির মোল্লা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, ফারিয়া ও তাঁর ভাই-বোন তাঁর দোকানে চুরি করেছিলেন। এ কারণে স্থানীয়রা তাদের গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখে।
অভিযুক্ত মনির বলেন, মারধরের বিষয়টি মিথ্যা। তারা আমার দোকানে চুরি করেছে। স্থানীয়রা তাদের গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখেছে। আফসানা, ফৌজিয়া সরদার ও নিশি সরদার তার মাথার চুল কেটেছে। আমি এর সঙ্গে জড়িত নই।
তরুণীকে কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।
অন্যদিকে, ভিডিওতে মারধরের ঘটনায় দেখা যাওয়া অভিযুক্ত আফসানা, ফৌজিয়া সরদার ও নিশি সরদার সাংবাদিকদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
মামলায় ৬ জনের নাম, গ্রেপ্তার ২
ঘটনার পর মঙ্গলবার রাতেই ভুক্তভোগীদের মা ফাতেমা বেগম বাদী হয়ে সখিপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
সখিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোফাজ্জল হুসাইন বলেন, খবর পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ভুক্তভোগীদের উদ্ধার করে। পরে লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ছয়জনকে এজাহারভুক্ত আসামি এবং আরও চার থেকে পাঁচজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করা হয়েছে।
ওসি বলেন, রাতভর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। বাকি এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কুপ্রস্তাবের প্রতিবাদ করায় তরুণী ও তাঁর দুই ভাই-বোনকে চুরির অপবাদ দিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে কি না, কিংবা ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না—তা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
