ফাইল ছবি
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির ২৮ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও পাহাড়ের আদিবাসী জনগোষ্ঠী এখনো কাঙ্ক্ষিত ও পূর্ণাঙ্গ ভূমির অধিকার ফিরে পায়নি। দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া। অনেক পরিবার নিজেদের বসতভিটা হারিয়ে অন্যের জমিতে কিংবা উদ্বাস্তু জীবনে দিন কাটাচ্ছে।
পাহাড়ের একাধিক সূত্রের দাবি, দীর্ঘ সময়েও আদিবাসীরা নিজেদের পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি পাননি। অভাব, অবহেলা, বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে চলছে তাদের জীবন। একসময় শান্ত হিসেবে পরিচিত পাহাড় এখন নানা সংঘাত ও অস্থিরতায় অশান্ত। বিভিন্ন গোষ্ঠীর রক্তচক্ষুর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতায় বসবাস করতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।
এমন বাস্তবতার মধ্যেই আগামীকাল রোববার পালিত হবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস-২০২৬। জাতিসংঘের এবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান: অধিকার এগিয়ে নেওয়া, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ এবং আন্তঃপ্রজন্মের কল্যাণ প্রচার’।
১৯৯৭ সালের চুক্তি, ২৮ বছরেও মেলেনি কাঙ্ক্ষিত শান্তি
দেশের বিশেষায়িত তিন পার্বত্য জেলা—বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল পাহাড়ের মানুষের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিনের ভূমি বিরোধের অবসান ঘটানো। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের ২৮ বছরেরও বেশি সময় পরও সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় এখনো ভূমি নিয়ে বিরোধ, উদ্বাস্তু সমস্যা, নিরাপত্তাহীনতা ও দারিদ্র্য বিরাজ করছে। নিজেদের ভূমিতে ফিরে গিয়েও অনেক পরিবার বসতভিটা কিংবা কৃষিজমির পূর্ণ অধিকার ফিরে পায়নি।
আবেদন করেও ১০ বছরেও ফেরেনি পাঁচ একর জমি
রাঙামাটির লংগদু উপজেলার ঘনমোড় মৌজার শিলকাটা গ্রামের জ্ঞান লাল চাকমা এর একটি উদাহরণ।
২০১৬ সালের ১৭ অক্টোবর তিনি খাগড়াছড়িতে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যালয়ে নিজের পাঁচ একর বসতভিটা ফেরত চেয়ে আবেদন করেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই আবেদনের নিষ্পত্তি হয়নি।
বর্তমানে তাঁর জমিতে পুনর্বাসিত লোকজন বসবাস করছেন বলে জানা গেছে। ভূমি বিরোধের নিষ্পত্তি না হওয়ায় জ্ঞান লালকে পরিবার-পরিজন নিয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলার দেবাছড়ি গ্রামে অন্যের ভূমিতে বসবাস করতে হচ্ছে।
নিজের জমির মালিক হয়েও অন্যের জমিতে বসবাস—জ্ঞান লাল চাকমার এই বাস্তবতাই যেন পাহাড়ের অনেক পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার প্রতিচ্ছবি।
জমি হারিয়ে উদ্বাস্তু জীবন
কৃষক ন্যালশন চাকমা পাহাড়ের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার পাবলাখালি থেকে পাশের দেশে শরণার্থী হিসেবে জীবন কাটিয়েছেন। সম্প্রতি নিজ ভূমিতে ফিরে এলেও নিজের জমিজমা এখনো ফিরে পাননি।
বর্তমানে তিনি একই উপজেলার সাজেক ইউনিয়নের বাঘাইহাট এলাকায় পরিবার নিয়ে উদ্বাস্তু মানুষের মতো জীবনযাপন করছেন।
জ্ঞান লাল ও ন্যালশন চাকমার মতো আরও অনেক পরিবার বসতভিটা হারিয়ে বছরের পর বছর উদ্বাস্তু জীবনের সঙ্গে লড়াই করছে।
কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমিস্বত্ব নিশ্চিত করে তাদের ভূমি অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। এ লক্ষ্যেই ভূমি সমস্যা সমাধানে ১৯৯৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করে সরকার।
পরবর্তীতে ২০০১ সালে কমিশনের আইন সংশোধনী আকারে জাতীয় সংসদে পাস হলে কমিশন পুনর্গঠিত হয়। সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারপতিকে চেয়ারম্যান করে নয় সদস্যের সমন্বয়ে কমিশন গঠন করা হয়।
তবে পার্বত্য চুক্তির কিছু ধারার সঙ্গে আইনের সাংঘর্ষিক অবস্থান থাকায় আইন সংশোধনে দীর্ঘ ১৬ বছর সময় লেগে যায়। পরে ২০১৬ সালে পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন জাতীয় সংসদে সংশোধনী আকারে পাস হয়।
এ কমিশনে তিন বছর মেয়াদে ইতোমধ্যে পাঁচজন চেয়ারম্যান পরিবর্তন হয়েছেন। বর্তমানে ষষ্ঠ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মুহাম্মদ আব্দুল হাফিজ।
তবে দীর্ঘ সময়েও ভূমি বিরোধের কাঙ্ক্ষিত নিষ্পত্তি না হওয়ায় কমিশনের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভারত থেকে ফিরেও অনেকেই ফেরত পাননি নিজের ভিটেমাটি
পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর ভারত থেকে ফিরে আসা উপজাতীয় শরণার্থী এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের চিহ্নিত ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সরকার উপজাতীয় শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু বিষয়ক টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করে।
এ কমিটিতেও ইতোমধ্যে পাঁচজন চেয়ারম্যান পরিবর্তন হয়েছেন। সর্বশেষ ষষ্ঠ চেয়ারম্যান হিসেবে সিনিয়র সচিব পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করা সুদত্ত চাকমা চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করায় বর্তমানে চেয়ারম্যানের পদটি শূন্য রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে ৮০ হাজারের বেশি পরিবার তালিকায় রয়েছে। ভারত থেকে প্রত্যাগত প্রায় ৩৭ হাজার পরিবারকে ২০ দফা প্যাকেজের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তারা নিয়মিত রেশন পেলেও অনেকেই এখনো নিজেদের ভিটেমাটি ফিরে পাননি।
২৮ বৈঠক, বাস্তবায়ন হয়নি সিদ্ধান্ত—অভিযোগ
টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য সন্তোষিত চাকমা বকুল বলেন, বর্তমানে টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান পদটি শূন্য। এর আগে কমিটির ২৮টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে কোনো সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন হয়নি।
তিনি বলেন, ১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত একপক্ষীয়ভাবে পাহাড়িদের ওপর হামলা, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ ২৯টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার কারণে জানমালের নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি উদ্বাস্তু হওয়া মানুষগুলো নিজেদের জমিও ফেরত পাননি।
সন্তোষিত চাকমার মতে, জাতিসংঘের ঘোষিত আদিবাসী ঘোষণাপত্র বাস্তবায়ন, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন এবং আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হলে এ অঞ্চলের আদিবাসীদের অস্তিত্ব, জানমাল ও ভূমির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
‘ভূমি অধিকারই আদিবাসীদের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত’
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান বলেন, আদিবাসীদের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ভূমি অধিকার ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভূমি অধিকার হচ্ছে সমষ্টিক অধিকার।
তিনি বলেন, যুগ যুগ ধরে প্রথাগত রীতিনীতির ভিত্তিতে আদিবাসীরা এই ভূমি অধিকার ভোগ করে আসছেন। কিন্তু সেই ভূমি অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে নানা কর্মসূচি
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের উদ্যোগে রোববার সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে র্যালি, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য জগদীশ চন্দ্র বর্মন।
অতিথি হিসেবে থাকবেন মানবাধিকার ও নারী অধিকার কর্মী খুশী কবির, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য আন্না মিনজ, সাবেক সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহসভাপতি উষাতন তালুকদার, অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, সাবেক সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদাসহ অনেকে।
এ ছাড়া খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান—তিন পার্বত্য জেলায় আদিবাসীরা দিবসটি উপলক্ষে শোভাযাত্রা, সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খুলনা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সিলেট, রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানেও দিবসটি পালনের কর্মসূচি রয়েছে।
প্রশ্ন একটাই—কবে ফিরবে পাহাড়ের মানুষের ভূমি অধিকার?
২৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে শান্তি চুক্তির বাস্তবায়নের অপেক্ষা, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতা, উদ্বাস্তু পরিবারের পুনর্বাসনের অনিশ্চয়তা এবং সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রশ্ন—সব মিলিয়ে পাহাড়ের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামনে এখনো বড় প্রশ্ন হয়ে আছে নিজের ভূমিতে নিজের অধিকার।
শান্তি চুক্তি যেখানে পাহাড়ে শান্তি, নিরাপত্তা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, সেখানে দীর্ঘ সময় পরও ভূমি হারানো মানুষের অপেক্ষা শেষ হয়নি। আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে তাই তাদের অন্যতম প্রধান দাবি—ভূমির অধিকার নিশ্চিত হোক, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হোক এবং পাহাড়ে ফিরে আসুক স্থায়ী শান্তি।
