নির্যাতনের পর আট মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর দাবি। আদালতে মামলা করার ঘোষণা ভুক্তভোগীর। ফাইল ছবি
লক্ষ্মীপুরে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে ৭০ লাখ টাকা আদায়, শারীরিক নির্যাতন এবং একের পর এক মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লোকমান হোসাইনের বিরুদ্ধে। সাবেক ছাত্রশিবির নেতা আব্দুর রহমান বিপ্লব ওরফে ‘শিবির বিপ্লব’ অভিযোগ করেছেন, তাঁকে হত্যার হুমকি দিয়ে তাঁর বাবার কাছ থেকে এক কোটি টাকা দাবি করেছিলেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। সন্তানকে বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত দেনদরবারের মাধ্যমে ৭০ লাখ টাকা দিতে বাধ্য হন তাঁর বাবা।
এ ঘটনায় সাবেক ওসি লোকমান হোসাইনের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন বিপ্লব। শারীরিক নির্যাতন ও অর্থ আদায়ের অভিযোগে শিগগিরই তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।
সোমবার (১২ অক্টোবর) দুপুরে লক্ষ্মীপুর প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন আব্দুর রহমান বিপ্লব। তিনি লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সাবেক সেক্রেটারি এবং লক্ষ্মীপুর পৌর শহরের বাঞ্চানগর এলাকার বাসিন্দা।
ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে বিপ্লব ২০১৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে অভিযোগ করেন, ওই দিন সকালে তৎকালীন ওসি লোকমান হোসাইনের নির্দেশে পুলিশ তাঁর বাসায় অভিযান চালায়। দরজা ভেঙে বাসায় প্রবেশের পর ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। একপর্যায়ে চোখ বেঁধে ও হাতকড়া পরিয়ে তাঁকে আটক করা হয়।
বিপ্লবের দাবি, আটকের পর তাঁকে থানার এলাকায় ওসির বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চোখের বাঁধন খুলে দুই হাত বেঁধে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়। দিনভর এভাবে ঝুলিয়ে রাখার পর রাতে মোটা লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। সারাদিন তাঁকে কোনো খাবারও দেওয়া হয়নি।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাত প্রায় ১১টার দিকে তৎকালীন জেলা পুলিশ সুপার আ স ম মাহাতাব উদ্দিন সেখানে উপস্থিত হলে তাঁকে ঝুলন্ত অবস্থা থেকে নামানো হয়। এরপর ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে পুলিশ তাঁর শরীরে বৈদ্যুতিক শক দেয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বেড়িবাঁধে নিয়ে হত্যার হুমকি, বিষাক্ত ইনজেকশন পুশের দাবি
বিপ্লব আরও অভিযোগ করেন, গভীর রাতে পুলিশ সদস্যরা তাঁকে গাড়িতে তুলে রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার বেড়িবাঁধ এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে আবারও মারধর করা হয় এবং হত্যার ভয় দেখিয়ে তাঁর শেষ ইচ্ছা জানতে চাওয়া হয়।
এ সময় এক গণমাধ্যমকর্মী তৎকালীন পুলিশ সুপারকে ফোন করে বিপ্লবের গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করেন বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
পরে তাঁকে রামগতি থানায় নিয়ে নির্যাতন চালানো হয় এবং শরীরে বিষাক্ত ইনজেকশন পুশ করা হয় বলেও অভিযোগ করেন বিপ্লব। এরপর লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানায় ফিরিয়ে আনা হলে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ পরিস্থিতিতে ওসি লোকমান তাঁর বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে জানান তিনি।
এক কোটি টাকা দাবি, ৭০ লাখ টাকা দেওয়ার অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে বিপ্লব বলেন, আমাকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে আমার বাবার কাছে এক কোটি টাকা দাবি করেন ওসি লোকমান। সন্তান হারানোর ভয়ে বাবা দেনদরবারের মাধ্যমে ৭০ লাখ টাকা দিতে বাধ্য হন।
তিনি আরও বলেন, অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অন্যদিকে, তাঁর বাবার ওপর চাপ সৃষ্টি করে ওই ৭০ লাখ টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বিপ্লবের দাবি, টাকা আদায়ের পর তাঁকে আটটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়। এর মধ্যে দুটি মামলায় তাঁর ২০ দিনের রিমান্ড চেয়েছিল পুলিশ। তবে আদালত রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
অন্য দুই আইনজীবীর কাছ থেকেও টাকা আদায়ের অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে শুধু বিপ্লব নয়, ২০১৬ সালে রায়পুর থানায় দায়িত্ব পালনকালে ওসি লোকমান হোসাইনের বিরুদ্ধে আরও দুই আইনজীবীর কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ তোলা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, রায়পুর পৌর জামায়াতের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিনের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা এবং রায়পুর পৌর শিবিরের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট ইমরান হোসেন পরানের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা আদায় করা হয়েছিল।
ওই দুই আইনজীবীর ভাষ্য, সে সময় তাঁদেরও মারধর করার পর টাকা নিয়ে মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছিল।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও চাকরিতে বহাল, প্রশ্ন বিপ্লবের
বিপ্লব অভিযোগ করেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে লক্ষ্মীপুরে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছেন ওসি লোকমান। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা কীভাবে চাকরিতে বহাল রয়েছেন, তা বোধগম্য নয়।
বিপ্লবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লোকমান হোসাইন বর্তমানে ঢাকার উত্তরায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে (এপিবিএন) কর্মরত আছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করে আইনগত প্রতিকার চাইবেন বলেও জানান বিপ্লব।
অভিযুক্ত ওসির বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার সাবেক ওসি লোকমান হোসাইনের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
তবে সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
