সোমবার, ২৬শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১০ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ক্রসফায়ার’ নিয়ে আইজিপির বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি টিআইবির, জবাবদিহি নিশ্চিত ও প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান, দায়িত্ব থেকে অপসারণেরও দাবি

সমতল মাতৃভূমি ডেস্ক
অক্টোবর ২৬, ২০২৬ ৮:৪৭ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ফাইল ছবি

সরকারের অনুমতি পেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনে পুলিশ ক্রসফায়ার করবে—পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) এমন বক্তব্যে তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা মোকাবিলা না করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে অপরাধ দমনের গ্রহণযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিপজ্জনক বার্তা দিচ্ছে এ বক্তব্য।

এ ঘটনায় আইজিপির বক্তব্য প্রত্যাহার, তাঁর জবাবদিহি নিশ্চিত এবং প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছে টিআইবি। একই সঙ্গে জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে দায়িত্ব থেকে অপসারণের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে এসব দাবি জানায় টিআইবি।

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিজেদের ব্যর্থতার ঢাল হিসেবে পুলিশপ্রধান ক্রসফায়ারকে ব্যবহার করতে চাইছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের অনুমতির শর্ত জুড়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা আইনসম্মতভাবে অপরাধ দমনে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

তিনি বলেন, পুলিশের মূল দায়িত্ব পেশাদার তদন্তের মাধ্যমে অপরাধী শনাক্ত করা এবং গ্রহণযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে বিচারের মুখোমুখি করা। এর বিকল্প হিসেবে ক্রসফায়ারকে সামনে আনা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সমাধান নয়; বরং পেশাগত দেউলিয়াত্বের দৃষ্টান্ত।

সরকারের অনুমতি বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দিতে পারে না

আইজিপির বক্তব্যে পরস্পরবিরোধী অবস্থান রয়েছে উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, একদিকে তিনি আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের কথা বলেছেন, অন্যদিকে সরকারের অনুমতি পেলে ক্রসফায়ার করার কথাও বলেছেন। এ দুই অবস্থান পরস্পরবিরোধী।

কোনো সরকারের অনুমতি বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দিতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত আইনের আশ্রয়লাভ এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নির্বাহী সিদ্ধান্তে বাতিল করা যায় না। অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, বিচারপ্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে কাউকে হত্যার এখতিয়ার পুলিশের নেই।

অতীতের ক্রসফায়ার ও নির্যাতনের ঘটনা স্মরণ করাল টিআইবি

অতীতের বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সিনহা হত্যা মামলায় পুলিশ সদস্যদের দণ্ড এবং মামলার রায়সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ এ পদ্ধতির ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দেয়।

টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হক কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনায় তাঁর পরিবারের প্রকাশ করা অডিও এবং হত্যার অভিযোগও ব্যাপক প্রশ্ন তুলেছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় সাবেক র‍্যাব কর্মকর্তাদের দণ্ড আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার অপরাধমূলক ব্যবহারের বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত উদাহরণ। অতীতের এসব ঘটনা থেকে পুলিশ কী শিক্ষা নিয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তর আইজিপিকেই দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।

মাঠপর্যায়ে বেআইনি বলপ্রয়োগের ঝুঁকি

টিআইবির বিবৃতিতে বলা হয়, পুলিশপ্রধানের এমন বেপরোয়া ও অপরিণামদর্শী বক্তব্য মাঠপর্যায়ে বেআইনি বলপ্রয়োগের প্রচ্ছন্ন ছাড়পত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যে কর্মকর্তার দায়িত্ব পুরো বাহিনীকে আইনের মধ্যে থেকে পরিচালনা করা, তিনিই যখন ক্রসফায়ারকে বিকল্প হিসেবে সামনে আনেন, তখন তাঁর দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

সংস্থাটি আরও প্রশ্ন তুলেছে, গত ১৪ সেপ্টেম্বর আইনমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সরকার সন্ত্রাস দমনে ক্রসফায়ারের পথে যাবে না এবং বিদ্যমান আইন দিয়েই সন্ত্রাস দমন সম্ভব। এরপরও পুলিশপ্রধান কেন সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে ক্রসফায়ারের সম্ভাবনা সামনে আনছেন, তার ব্যাখ্যা চেয়েছে টিআইবি।

সরকারের ঘোষিত অবস্থানের সঙ্গে আইজিপির বক্তব্যের অসংগতির ব্যাখ্যা এবং এ বিষয়ে তাঁর জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা স্পষ্ট করার আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাটি।

প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর সীমা

পুলিশের বলপ্রয়োগ অবশ্যই আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক হতে হবে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে টিআইবি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, আগ্নেয়াস্ত্রের ইচ্ছাকৃত প্রাণঘাতী ব্যবহার কেবল জীবন রক্ষার জন্য কঠোরভাবে অনিবার্য পরিস্থিতিতেই গ্রহণযোগ্য।

এই সীমিত সুযোগকে বিচারবহির্ভূত হত্যার অনুমোদন হিসেবে উপস্থাপনের কোনো সুযোগ নেই বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ নিয়েও উদ্বেগ

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অর্থ না পেয়ে পুলিশের সমালোচনা করার অভিযোগের প্রসঙ্গেও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে টিআইবি। সংস্থাটি বলেছে, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

কিন্তু ঢালাও অভিযোগ মুক্ত গণমাধ্যমের নজরদারি ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। একই সঙ্গে এ ধরনের বক্তব্য স্বাধীন সাংবাদিকতাকে নিরুৎসাহিত করার ঝুঁকি তৈরি করে।

টিআইবির মতে, পুলিশের কাজের পরিবেশ ও সক্ষমতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা বৈধ সমালোচনা এড়ানোর যুক্তি হতে পারে না।

বক্তব্য প্রত্যাহার ও প্রশাসনিক জবাবদিহির দাবি

বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো গুরুতর বিষয়ে পুলিশপ্রধানের বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা গ্রহণের পাশাপাশি তা প্রত্যাহার, প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া এবং তাঁর প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।

সংস্থাটির বক্তব্য, অপরাধ দমনের দায়িত্ব পালনে আইনের শাসন, পেশাদার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার ওপরই নির্ভর করতে হবে। সরকারের অনুমতির শর্তে ক্রসফায়ারের মতো পদক্ষেপের কথা বলা আইনসম্মত অপরাধ দমনের বিকল্প হতে পারে না।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।