সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সংস্কারের নতুন প্রত্যাশা তৈরি হলেও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ঠিকাদারি বাণিজ্যকে ঘিরে ভিন্ন এক চিত্রের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি—বিগত আওয়ামী লীগ আমলে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেট এখনও সক্রিয় রয়েছে এবং নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে তারা অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ও সরবরাহ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে।
অভিযোগ রয়েছে, অতীতে যেসব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা, কেন্দ্রীয় মুরগি খামার, সাভার ডেইরি ফার্ম এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে একচেটিয়া ব্যবসা করত, তাদের অনেকেই এখনও বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ পাচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ, অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে।
পুরোনো সিন্ডিকেটের নতুন পরিচয়, একই নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
একাধিক সূত্রের দাবি, অতীতে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালকের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ছাগল উন্নয়ন প্রকল্প, প্রুভেন বুল প্রকল্প, ছিটমহল প্রকল্প, সাভার ডেইরি ফার্ম, কেন্দ্রীয় মুরগি খামার, কুমিল্লা মুরগি খামার, নারায়ণগঞ্জ হাঁস খামার, সীতাকুণ্ড হাঁস-মুরগি খামার এবং হাটহাজারী ডেইরি ফার্মসহ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে একই গোষ্ঠীর ঠিকাদারদে আধিপত্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দরপত্রে এমন সব শর্ত সংযুক্ত করা হচ্ছে যা নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেয়। এর ফলে প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই একক দরদাতা কাজ পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
দরপত্র মূল্যায়নে ‘একই মুখ’, প্রশ্নের মুখে স্বচ্ছতা
অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের সময় যেসব কর্মকর্তা অধিকাংশ দরপত্র মূল্যায়নের দায়িত্ব পালন করতেন, তাদের কয়েকজন এখনও গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন কমিটিতে দায়িত্ব পালন করছেন।
অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, কিছু ক্ষেত্রে নিয়মনীতি ও সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) যথাযথভাবে অনুসরণ না করে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাকে ঘিরে বিতর্ক
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এক নন-ক্যাডার ৯ম গ্রেডের ভেটেরিনারি সার্জনকে ঘিরেও নানা অভিযোগ উঠেছে।
একাধিক কর্মকর্তার দাবি, তাকে অসংখ্য দপ্তরের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য কিংবা সভাপতি করা হয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারি ক্রয়বিধি সম্পর্কে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই কর্মকর্তার জন্য সার্বক্ষণিক সরকারি গাড়ি বরাদ্দ রয়েছে এবং সেই গাড়ি ব্যক্তিগত ও অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেও তিনি আলোচনায় রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে।
নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, ওই কর্মকর্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নাম বিভিন্ন প্রকল্পে উঠে এসেছে।
সূত্রের দাবি, প্রায় ৯৮ লাখ টাকার একটি ওষুধ সরবরাহ প্যাকেজে একক দরদাতা হিসেবে একটি প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পেয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দরপত্রে প্রয়োজনীয় কিছু নথিপত্র না থাকলেও প্রতিষ্ঠানটিকে যোগ্য ঘোষণা করা হয়।
আরও অভিযোগ রয়েছে, কয়েক মাস আগে কার্যাদেশ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ওষুধ সরবরাহ সম্পন্ন হয়নি, ফলে প্রকল্পের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
নিম্নমানের পশুখাদ্য ও খাদ্যশৃঙ্খলে নীরব বিপদ?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ উঠেছে পশুখাদ্য সরবরাহ নিয়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কয়েক কোটি টাকার পশুখাদ্য সরবরাহের কাজে নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহ করা হয়েছে, যার সঙ্গে দরপত্রে জমা দেওয়া নমুনার মিল নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিম্নমানের বা ভেজাল পশুখাদ্যে অতিরিক্ত রাসায়নিক, ছত্রাকজনিত বিষাক্ত উপাদান, নিম্নমানের কাঁচামাল কিংবা দূষিত উপাদান থাকলে তা পশুর স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এর প্রভাব পরবর্তীতে দুধ, মাংস ও ডিমের মাধ্যমে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ক্ষমতার অপব্যবহার করে সিনিয়রিটি লঙ্ঘন করে নিজেই প্রধান অতিথি বনে গেছেন। ফাইল ছবি
সম্ভাব্য ঝুঁকি: প্রাণীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস, দুধ, মাংস ও ডিমের গুণগত মানের অবনতি, খাদ্যদূষণের ঝুঁকি বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব, খাদ্যনিরাপত্তা ও জনআস্থার সংকট।
খামার সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিভিন্ন খামার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে স্বতন্ত্র পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।
কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সৎ কর্মকর্তারা প্রভাবমুক্তভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছেন না।
তাদের দাবি, বিগত সরকারের সময় গড়ে ওঠা প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ভেঙে না দিলে অধিদপ্তরে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।
তদন্তের দাবি জোরালো
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ মন্ত্রণালয়, সচিবালয় এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি বিষয়ে জরুরি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন—
গত এক বছরের সব বড় সরবরাহ কাজের নিরীক্ষা;
পশুখাদ্যের নমুনা সংগ্রহ করে স্বাধীন ল্যাব পরীক্ষার ব্যবস্থা;
দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির কার্যক্রম পর্যালোচনা;
একক দরদাতা হিসেবে প্রাপ্ত প্যাকেজগুলোর তদন্ত;
সরকারি যানবাহারের ব্যবহার ও প্রশাসনিক সুবিধার নিরীক্ষা;
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের আর্থিক ও প্রশাসনিক যোগসূত্র অনুসন্ধান।
উল্লেখ্য যে, সরকার পরিবর্তনের পরও যদি পুরোনো সিন্ডিকেট নতুন পরিচয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থ ও জনস্বার্থের ওপর প্রভাব বিস্তার করে, তবে সেটি শুধু প্রশাসনিক অনিয়মের প্রশ্ন নয়; বরং খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার জন্যও বড় হুমকিতে পরিণত হতে পারে।
অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে পশুখাদ্যের মান যাচাই এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। কারণ, খামারে সরবরাহ হওয়া নিম্নমানের খাদ্যের প্রভাব শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় সাধারণ মানুষের খাবারের টেবিলে।
প্রশ্ন একটাই—খামারের পশুখাদ্যে যদি বিষাক্ত উপাদান ঢুকে পড়ে, তবে তার শেষ গন্তব্য কি আমাদেরই খাবারের প্লেট নয়?
