মঙ্গলবার, ২১শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

গ্যারেজবন্দি স্বপ্ন, থমকে স্বাস্থ্যসেবা: ৮৭৯ গাড়ির নিঃশব্দ মৃত্যুতে বিপন্ন জনস্বাস্থ্য

স্টাফ রিপোর্টার
এপ্রিল ২১, ২০২৬ ১:২৫ অপরাহ্ণ
Link Copied!

স্বাস্থ্য খাতের জন্য একসময় আশার প্রতীক ছিল ৮৭৯টি সরকারি গাড়ি। পাহাড় পেরিয়ে, নদী ডিঙিয়ে, প্রত্যন্ত গ্রামে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়েই এগুলো নামানো হয়েছিল মাঠে। কিন্তু আজ সেই গাড়িগুলোই নিঃশব্দে পড়ে আছে—কোথাও অন্ধকার গ্যারেজে বন্দি, কোথাও খোলা আকাশের নিচে ধুলো আর বৃষ্টির কাছে আত্মসমর্পণ করে।

স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের এই গাড়িগুলো কেনা হয়েছিল একটি বৃহৎ স্বাস্থ্য প্রকল্পের আওতায়। প্রকল্প শেষ হয়েছে প্রায় দুই বছর আগে। তারপর থেকে যেন সময় থেমে গেছে—চাকা আর ঘোরেনি, ইঞ্জিন আর জ্বলেনি। অযত্ন আর অবহেলায় ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছে রাষ্ট্রের কোটি টাকার সম্পদ।

এই অচলাবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়েছে জনস্বাস্থ্যে। শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই), যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ—এসব গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে মাঠপর্যায়ের তদারকি আজ ভীষণভাবে ব্যাহত। ফলে নীরবে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি, অদৃশ্য শত্রুর মতো ছড়িয়ে পড়ছে রোগ।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ১৯৯৮ সাল থেকে অপারেশন প্ল্যান (ওপি) এর মাধ্যমে ৩৮টি রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি চালু ছিল। এসব কর্মসূচির তদারকির জন্যই ধাপে ধাপে কেনা হয়েছিল এই ৮৭৯টি গাড়ি। কিন্তু ২০২৪ সালের জুনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার এই কর্মসূচি গুটিয়ে নিলে থেমে যায় গাড়ির চলাচলও।

পরবর্তীতে নতুন করে পরিকল্পনা নেওয়া হলেও গত বছরের ৫ মার্চ তা বাতিল করে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। যদিও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকার আবার কিছু কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, তবু গাড়িগুলোর ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত।

মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, এই গাড়িগুলোর অভাবে তাদের কাজ যেন ডানা হারানো পাখির মতো হয়ে গেছে। নিয়মিত তদারকি না থাকায় টিকাদান কার্যক্রম ও রোগ নির্ণয় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গাড়িগুলোর টায়ার শক্ত হয়ে যাচ্ছে, ব্যাটারি নিঃশেষ, ইঞ্জিন প্রায় বিকল—যেন সময়ের কাছে হেরে যাওয়া একেকটি যন্ত্র।

গত বছর ১৫ জুন অর্থ মন্ত্রণালয় নির্দেশ দেয়, এসব গাড়ি সরকারি পরিবহন পুলে জমা দিতে। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগ এখনো একটি গাড়িও জমা দেয়নি। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা—একবার চলে গেলে আর ফিরে পাওয়া যাবে না, হারিয়ে যাবে স্বাস্থ্য খাতের নিজস্ব শক্তি।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর সঙ্গে বৈঠকে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা গাড়ি সচল করার দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিয়ে বলেন, গাড়ির প্রয়োজন আছে। আমাদের একটু সময় দিন—সমাধান আসবে।

এই বহরে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের গাড়ি—টয়োটা র‍্যাব ফোর, মিতসুবিশি এক্সপান্ডার, আউটল্যান্ডার, অ্যাম্বুলেন্স, মাইক্রোবাস, জিপ, এমনকি ওষুধ পরিবহনের কাভার্ডভ্যানও। একসময় করোনার মতো দুর্যোগে এসব গাড়িই ছিল জীবনরেখা। আজ তারা নিঃসঙ্গ, নিশ্চল।

মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা আরও করুণ। গত ১২ এপ্রিল পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় মোটরসাইকেলে করে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গুরুতর আহত হন এক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। অথচ কিছুদিন আগেও তিনি সরকারি গাড়িতেই কাজ করতেন। এখন অনেক কর্মকর্তাকেই নিজের খরচে বা ঝুঁকি নিয়ে মোটরসাইকেলে ঘুরতে হচ্ছে।

তবু কিছু ব্যতিক্রম আছে—চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর এক কর্মকর্তা ব্যক্তিগত খরচে গাড়ি সচল রেখে সেবা চালিয়ে যাচ্ছেন। যেন অন্ধকারে এক টুকরো আলো, দায়িত্ববোধের এক নীরব প্রতিচ্ছবি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—এই ২২ মাসের অচলাবস্থা শুধু সম্পদের অপচয় নয়, এটি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত। তদারকি বন্ধ মানেই জবাবদিহির ঘাটতি, আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি।

স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। আর স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

গাড়িগুলো যেন এখনো অপেক্ষায়—আবার কোনো এক সকালে ইঞ্জিন জ্বলে উঠবে, চাকা ঘুরবে, আর দূর গ্রামের কোনো শিশুর কাছে পৌঁছে যাবে জীবনরক্ষাকারী একটি টিকা। কিন্তু সেই সকাল কত দূরে—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।