মঙ্গলবার, ১লা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

দুই যুগেও সরেনি চেয়ার, অদৃশ্য শক্তির বলয়ে রেলওয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারী লুৎফা বেগমের ‘অলৌকিক রাজত্ব’

স্টাফ রিপোর্টার
সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬ ৬:৪৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

অফিসে যাতায়াত করেন প্রায় তিন হাজার সিসির বিলাসবহুল টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার ডাবল কেবিন পিকআপে। অথচ পদমর্যাদায় তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান সংস্থাপন কর্মকর্তার (সিপিও) কার্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির একজন কর্মচারী। নাম লুৎফা বেগম।

একই দপ্তরে টানা ২৩ বছর চাকরি, বদলি না হওয়া, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, সহকর্মীদের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তারের অভিযোগ, আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের তথ্য এবং সরকারি গাড়ি ব্যবহারের বিতর্ক—সব মিলিয়ে লুৎফা বেগমকে ঘিরে রেলওয়ের ভেতরে-বাইরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দুই যুগেও একই চেয়ারে তাঁর অবস্থান কীভাবে সম্ভব?

রেলওয়ের নথি অনুযায়ী, ২০০৪ সালে সিপিও (পূর্ব) কার্যালয়ে যোগ দেন লুৎফা বেগম। এরপর ২০২৬ সাল পর্যন্ত কোনো বদলি ছাড়াই তিনি একই দপ্তরে বহাল রয়েছেন। প্রায় দুই যুগ ধরে একই কর্মস্থলে এমন দীর্ঘ অবস্থান নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী।

সাধারণত বড় সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক প্রয়োজন, দাপ্তরিক ভারসাম্য ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত বদলি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু লুৎফা বেগমের ক্ষেত্রে সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কার্যত থমকে আছে বলে অভিযোগ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রশাসনের নীরবতার সুযোগে কোনো কোনো কর্মচারী দীর্ঘদিন একই জায়গায় থেকে ধীরে ধীরে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। পরে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তাঁরা নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেন। এটি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতার জন্য উদ্বেগের বিষয়।

বদলি-নিয়োগের ফাইলেও প্রভাবের অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন একই দপ্তরে থাকার সুযোগে লুৎফা বেগম সেখানে একটি শক্তিশালী নিজস্ব বলয় তৈরি করেছেন। বদলি, নিয়োগ, পেনশন, সাময়িক বরখাস্তসংক্রান্ত ফাইল, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও টিএলআর নিয়োগসহ বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে তাঁর প্রভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির মহিলাবিষয়ক সম্পাদক থাকার সুবাদে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের অবস্থান শক্ত করেন বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। বিশেষ করে সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।

অতীতে সহকর্মীদের সঙ্গে অশালীন আচরণের অভিযোগে তাঁকে দুবার শোকজ করা হলেও রাজনৈতিক প্রভাবে সেগুলো বাতিল করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তাঁর প্রভাব কমেনি—এমন অভিযোগও রয়েছে। বরং রেলওয়ে মহাপরিচালকের কার্যালয়ের সহায়তায় তিনি সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি পেয়েছেন বলে জানা গেছে।

স্বল্প বেতনের চাকরি, সম্পদের হিসাব কোথায়?

লুৎফা বেগমের আর্থিক সঙ্গতি নিয়েও উঠেছে নানা প্রশ্ন। স্বল্প বেতনের সরকারি চাকরি করেও তাঁর ও পরিবারের নামে একাধিক স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে বলে অভিযোগ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চট্টগ্রামের হালিশহরের কৃষ্ণচূড়া অ্যাপার্টমেন্টে তাঁর দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এ ছাড়া নালাপাড়াসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সম্পত্তি, ঢাকায় বাড়ি এবং গ্রামের বাড়িতে উল্লেখযোগ্য সম্পদ রয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস এবং তাঁর ঘোষিত আয়-সম্পদের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—তা যাচাই করা হয়নি। ফলে সম্পদের বিষয়টি কেবল অভিযোগের পর্যায়ে না রেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথিপত্র যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রেলওয়ের কর্মচারী, যাতায়াত বিলাসবহুল গাড়িতে-

লুৎফা বেগমকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে তাঁর অফিসে যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার পিকআপটি। গাড়িটির নম্বর—ঢাকা মেট্রো-ঠ-১১-৩৫৪৪।

বিআরটিএর তথ্যমতে, ২০০১ সালে নিবন্ধিত এই গাড়িটির মালিক ঢাকা সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (রমনা সড়ক ভবন)।

সওজের সহকারী বৃক্ষপালনবিদ হিসেবে কর্মরত লুৎফা বেগমের স্বামী রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমে দাবি করেন, গাড়িটি তাঁর নামে বরাদ্দ এবং অফিসিয়াল কাজ শেষে সময় পেলে তিনি স্ত্রীকে আনা-নেওয়ার জন্য গাড়িটি ব্যবহার করতে দেন।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহে আরেফীন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সহকারী প্রকৌশলী বা সমমানের কর্মকর্তারা সাধারণত পুলের গাড়ি ব্যবহার করেন। ব্যক্তিগত গাড়ি সাধারণত দপ্তরপ্রধানদের জন্য বরাদ্দ থাকে।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—সওজের একটি গাড়ি রেলওয়ের একজন দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারী নিয়মিত অফিসে যাতায়াতের কাজে কীভাবে ব্যবহার করছেন? গাড়িটি কীভাবে বরাদ্দ, কার অনুমোদনে এবং কোন বিধির আওতায় ব্যবহার করা হচ্ছে—তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

‘অলৌকিক শক্তি’ই কি তাঁর রক্ষাকবচ?

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে লুৎফা বেগমের মুঠোফোনে কল এবং হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানো হলে তিনি ব্যঙ্গাত্মক ইমোজি দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান।

তবে এর আগে অপর একটি সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন, তিনি জানেন কে এসব পাঠিয়েছে। একটি পক্ষ পদোন্নতির আশায় তাঁকে সরানোর চক্রান্ত করছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তাঁর ভাষ্য ছিল, আল্লাহর অলৌকিক শক্তি ছাড়া কোনো অশুভ শক্তি তাঁকে সরাতে পারবে না এবং তাঁর প্রশাসন তাঁকে ভালোভাবে চেনে।

তদন্তেই মিলতে পারে আসল চিত্র

দুই যুগের বেশি সময় একই দপ্তরে অবস্থান, কথিত রাজনৈতিক প্রভাব, দাপ্তরিক কাজে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ, আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য এবং সরকারি গাড়ি ব্যবহারের বিতর্ক—প্রতিটি বিষয়ই এখন আলাদা করে খতিয়ে দেখার দাবি রাখে।

রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশ্ন, একজন দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারী কীভাবে টানা ২৩ বছর একই দপ্তরে থেকে এতটা প্রভাবশালী হয়ে উঠলেন? তাঁর বদলি কেন হয়নি, সম্পদের উৎস কী, গাড়ি ব্যবহারের অনুমোদন কোথায় এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ফাইলে তাঁর ভূমিকা কতটুকু—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রশাসনিক তদন্তেই স্পষ্ট হতে পারে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সওজ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে লুৎফা বেগমের অবস্থানও স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

কারণ, একজন কর্মচারীর দুই যুগের ‘অপরিবর্তনীয় চেয়ার’ শুধু ব্যক্তিগত প্রভাবের গল্প নয়—এটি সরকারি প্রশাসনের জবাবদিহি, বদলি নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থারও বড় প্রশ্ন।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।