শুল্ক ফাঁকি, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, বিএসটিআই ছাড়পত্র ছাড়া পণ্য খালাস ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ—তদন্ত চেয়ে লিখিত আবেদন। ফাইল ফটো
ঢাকা কাস্টম হাউসের উপকমিশনার মো. আমিনুল ইসলামকে ঘিরে উঠেছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ। ভুয়া ইউডি (Utilization Declaration) ব্যবহার করে পণ্য খালাস, শুল্ক ফাঁকি, চোরাচালানে সহযোগিতা, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ছাড়াই পণ্য ছাড় এবং অবৈধভাবে অর্থ গ্রহণের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, এসব অনিয়মের নেপথ্যে রয়েছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। আর সেই চক্রের কার্যক্রমে উপকমিশনার মো. আমিনুল ইসলামের ভূমিকা রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তবে লিখিত অভিযোগে উত্থাপিত এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও এখন পর্যন্ত অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। ফলে অভিযোগগুলোকে তদন্তসাপেক্ষ দাবি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
ভুয়া ইউডিতে বন্ধ প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্য খালাসের অভিযোগ
লিখিত অভিযোগে সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে বন্ধ হয়ে যাওয়া বন্ডভুক্ত প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া ইউডি ব্যবহার করে শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য খালাসের অভিযোগ।
অভিযোগ অনুযায়ী, Alien Apparels Ltd, Uranus Apparels (Pvt.) Ltd এবং QUICK APPARELS LIMITED—এই তিনটি বন্ধ বন্ড প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য খালাস করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, কুরিয়ার খাঁচায় আসা পণ্য এসব প্রতিষ্ঠানের নামে খালাসের পুরো প্রক্রিয়ায় মো. আমিনুল ইসলামের প্রত্যক্ষ যোগসাজশ ছিল। বিষয়টি সত্য হলে তা কাস্টমসের বন্ড সুবিধা ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
অভিযোগে কাস্টমসের প্রিভেন্টিভ শাখার একজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা, কমিশনারের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) এবং একজন রাজস্ব কর্মকর্তার ভূমিকাও খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারীর ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বকালীন কার্যক্রম, ইউডি অনুমোদন, পণ্য চালান, বিল অব এন্ট্রি এবং খালাসের নথি যাচাই করা হলে কথিত ভুয়া ইউডি ব্যবহার করে পণ্য খালাসের পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
চোরাচালানে সহযোগিতার অভিযোগ, তদন্তে কারা?
লিখিত অভিযোগে মো. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে চোরাচালান ও অবৈধভাবে পণ্য খালাসে সহযোগিতার অভিযোগও আনা হয়েছে।
এতে কাস্টমসের সরকার হানিফের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি হানিফ ও শরিফ নামে আরও দুই ব্যক্তির সঙ্গে আমিনুল ইসলামের যোগাযোগ ও সংশ্লিষ্টতার দাবিও করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, ভুয়া ইউডির মাধ্যমে পণ্য খালাসের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হলে কথিত পুরো নেটওয়ার্কের কার্যক্রম স্পষ্ট হতে পারে।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, ঘটনাগুলোকে ফৌজদারি মামলার আওতায় না এনে অন্য উপায়ে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এ দাবিরও স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিএসটিআই ছাড়পত্র ছাড়াই শিশু খাদ্য ও প্রসাধনী খালাস?
অভিযোগের আরেকটি বিস্ফোরক অংশে শিশু খাদ্য ও প্রসাধনীজাত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে অনিয়মের কথা বলা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, কিছু আমদানিকৃত পণ্য বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক ছাড়পত্র ছাড়াই প্রভাব খাটিয়ে খালাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এমনকি অভিযোগকারীর দাবি, এসব পণ্য ছাড়ের বিনিময়ে মো. আমিনুল ইসলাম প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৮০ লাখ টাকা অবৈধভাবে গ্রহণ করেন।
তবে বিপুল অঙ্কের এই অর্থ লেনদেনের দাবির পক্ষে কোনো ব্যাংক হিসাব, আর্থিক লেনদেনের নথি কিংবা স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ অভিযোগের সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে দাবিটির সত্যতা নির্ধারণে আর্থিক নথি ও সংশ্লিষ্ট চালান-খালাসের তথ্য যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
‘Closet Cloud’ ঘিরেও প্রশ্ন
অভিযোগপত্রে Closet Cloud নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে মো. আমিনুল ইসলামের এক নিকটাত্মীয়ের সম্পর্ক রয়েছে। অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিআইএন (BIN) ও টিআইএন (TIN) নম্বরও উল্লেখ করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে পণ্যের মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা হচ্ছে এবং এর ফলে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী সাবিহা জাহানের সঙ্গে মো. আমিনুল ইসলাম কিংবা তার পরিবারের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
সাবেক এনবিআর সদস্যের প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ
অভিযোগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসনের সদ্য সাবেক সদস্য মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, মোয়াজ্জেম হোসেনের প্রভাব ও ক্ষমতা ব্যবহার করে মো. আমিনুল ইসলাম বিভিন্ন অনিয়ম এবং অবৈধভাবে পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেছেন।
তবে এ দাবিরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও নথিপত্রের ভিত্তিতে বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন।
আয়-সম্পদ বনাম জীবনযাপন—উঠছে নতুন প্রশ্ন
লিখিত অভিযোগে মো. আমিনুল ইসলামের আয়কর নথি নম্বর উল্লেখ করে তার বৈধ আয়, ঘোষিত সম্পদ ও জীবনযাপনের মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারীর মতে, তার আয়, সম্পদ, সম্পদের উৎস এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের তথ্য যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে।
বিশেষ করে কাস্টমসের মতো রাজস্ব আদায়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকারী একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যখন শুল্ক ফাঁকি, ভুয়া ইউডি, পণ্য খালাস এবং অবৈধ অর্থ লেনদেনের মতো অভিযোগ ওঠে, তখন তার ঘোষিত আয়-সম্পদের সঙ্গে বাস্তব সম্পদের সামঞ্জস্য আছে কি না—তা যাচাইয়ের বিষয়টি সামনে আসাই স্বাভাবিক।
বক্তব্য মেলেনি আমিনুল ইসলামের
অভিযোগগুলোর বিষয়ে মো. আমিনুল ইসলামের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে প্রতিবারই ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র
ভুয়া ইউডি ব্যবহার, বন্ধ বন্ড প্রতিষ্ঠানের নামে শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য খালাস, শুল্ক ফাঁকি, বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক ছাড়পত্র ছাড়া পণ্য ছাড়, কথিত অবৈধ অর্থ লেনদেন এবং সম্পদের উৎস নিয়ে ওঠা প্রশ্ন—সবগুলো অভিযোগই গুরুতর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট ইউডি, বিল অব এন্ট্রি, ইনভয়েস, বন্ড লাইসেন্সের বর্তমান অবস্থা, পণ্য চালান, খালাসের নথি, বিএসটিআই ছাড়পত্র, ব্যাংক লেনদেন, আয়কর নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বকালীন সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অভিযোগগুলো সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আবার অভিযোগের কোনো অংশ অসত্য হলে তদন্তের মাধ্যমেই সেটিও পরিষ্কার হওয়া সম্ভব।
এখন মূল প্রশ্ন—ভুয়া ইউডিতে পণ্য খালাসের অভিযোগের নেপথ্যে আসলে কারা, কীভাবে বন্ধ প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্য ছাড় হলো, কথিত অর্থ লেনদেনের কোনো বাস্তব ভিত্তি আছে কি না এবং এসব ঘটনায় মো. আমিনুল ইসলামের ভূমিকা কতটুকু?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখন নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তদন্তের ওপর। সংশ্লিষ্ট মহলও তাকিয়ে আছে—অভিযোগের স্তর পেরিয়ে তদন্তে শেষ পর্যন্ত কী তথ্য সামনে আসে।
বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী প্রতিবেদনে। চলবে….
